নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ চলে গেলেন

আসিফুররহমান সাগর ও মো. আল-মামুন : নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ আর নেই। বাংলাদেশের মানুষকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে পরপারে চলে গেলেন অসামান্য কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। ক্যান্সার নিয়ে চিকিত্সাধীন অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বেলভ্যু হাসপাতালে তিনি গতকাল মধ্যরাতে ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহে…… রাজেউন)। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশে-বিদেশে তার অনুরাগীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রবাসী বাংলাদেশিরা ছুটে যান হাসপাতালে।
হুমায়ূন আহমেদের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করতে তার পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে বৈঠকে বসেন। তাদেরকে সহায়তা করেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. এম এ মোমেন। অসাধারণ প্রাণশক্তির এই মানুষটি সারাজীবন ধরে দেখিয়ে এসেছেন ইচ্ছাশক্তি থাকলে, একাগ্রতা থাকলে, ভালোবাসা থাকলে সব সম্ভব। তার সেই মন্ত্রের জোরে মানুষ এটাও বিশ্বাস করেছিল যে, দুরারোগ্য ক্যান্সারকে পরাজিত করে তিনি ফিরে আসবেন তেরোশ নদীর দেশ— এই বাংলায়। সারাদেশের মানুষের আকুতি ছিল— ব্যাধিকে জয় করে ফিরে এসো হুমায়ূন। কিন্তু তা আর হলো না। জীবন মৃত্যুর দোলাচলে দুলে- দেশের মানুষকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
কদিন ধরেই সারাদেশে তার সুস্থতার বিষয়ে জল্পনা চলছিল। সবার মনে প্রশ্ন, ফিরবেন কী হুমায়ূন আহমেদ? আবার কি তার অসামান্য লেখনীর দেখা পাবে না বাংলাদেশের মানুষ। তার বইয়ে চোখ রেখে আবার কি জীবনকে, মানুষকে ভালোবাসার স্বপ্নে বিভোর হবে না তরুণপ্রজন্ম! কিন্তু তা আর হলো না। মাত্র ৬৪ বছর বয়সে চলে গেলেন। গতকাল গভীর রাত থেকেই বাংলার ঘরে ঘরে হাহাকার। শোকাকুল মানুষ কেঁদে কেঁদে বলে চলেছে, এত তাড়াতাড়ি যেতে নেই, এভাবে যেতে নেই হুমায়ূন।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. এম এ মোমেন বৃহস্পতিবার রাতে নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের বেলভ্যু হাসপাতালে চিকিত্সাধীন হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টার দিকে হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় এই লেখক হুমায়ূন আহমেদের বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর। ১৯৪৮ সালে নেত্রকোণা জেলায় তার জন্ম হয়।
হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন, ছোট ভাই ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, বন্ধু মাজহারুল ইসলাম, ড. মোমেন মৃত্যুর সময় হাসপাতালে ছিলেন। তাকে দেখতে বাংলাদেশ থেকে নিউইয়র্কে ছুটে গিয়েছিলেন তার বন্ধু আসাদুজ্জামান নূর এমপি।
ক্যান্সারের চিকিত্সা নিতে যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার পর একুশে পদকজয়ী হুমায়ূনকে জাতিসংঘে বাংলাদেশ মিশনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা নিয়োগ করে সরকার।
বৃহদান্ত্রে ক্যান্সার ধরা পড়ার পর গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর চিকিত্সার জন্য নিউইয়র্কে যান হুমায়ূন আহমেদ। সেখানে মেমোরিয়াল স্লোয়ান-কেটরিং ক্যান্সার সেন্টারে চিকিত্সা নিতে শুরু করেন তিনি। দুই পর্বে মোট ১২টি কেমোথেরাপি নেয়ার পর গত ১২ জুন বেলভ্যু হাসপাতালে হুমায়ূন আহমেদের দেহে অস্ত্রোপচার হয়। এরপর বাসায় ফিরেছিলেন এই লেখক। স্ত্রী শাওনসহ সন্তানদের নিয়ে কুইন্সে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকছিলেন তিনি। অবস্থার অবনতি হলে পুনরায় বেলভ্যু হাসপাতালে নেয়া হয় তাকে। সেখানে গত কয়েকদিন ধরে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ছিলেন তিনি।
অস্ত্রোপচারের আগে পরিবার-আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে গত মাসে দুই সপ্তাহের জন্য দেশে আসেন হুমায়ূন আহমেদ। পুরো সময় গাজীপুরে নুহাশ পল্লীতে কাটিয়েছিলেন তিনি।
বাংলার মানুষের প্রিয় এই লেখক তার ৬১তম জন্মদিনে বলেন, মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত লিখে যেতে চাই। লেখালেখিই আমার বিশ্রাম। লেখালেখি বন্ধ হলে আমার বেঁচে থাকা অর্থহীন হয়ে পড়বে, আমি বাঁচতে পারবো না। পাঠকদের উদ্দেশে তার আবেদন- ‘দোয়া করবেন, আমি যেন আমৃত্যু লিখে যেতে পারি।’ হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লিখে গেছেন। হাসপাতালের বেডে অপারেশনে যাবার আগ পর্যন্তই তার কলম সচল ছিল।
মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এযাত্রা ঘাতক ক্যান্সারকে ফাঁকি দিতে পারলেন না। চলে গেলেন অকালে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাকে আটক করে এবং নির্যাতনের পর হত্যার জন্য গুলি চালায়। তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। ২০১১-এর সেপ্টেম্বর মাসে তার দেহে অন্ত্রীয় ক্যান্সার ধরা পড়ে। ২০১১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর হুমায়ূন আহমেদ চিকিত্সার জন্য নিউইয়র্ক যান। প্রথমে মেমোরিয়াল সোলান ক্যাটারিং হাসপাতালে ড. স্টিফেন আর ভিচের তত্ত্বাবধানে তিনটি ক্যামোথেরাপী নেন। পরবর্তী সময়ে নিউইয়র্ক শহরের ম্যানহাটানের বেলভ্যু হাসপাতালে অনকোলজি বিভাগের ডা. জেইনের তত্ত্বাবধানে চিকিত্সা করান। প্রথম পর্যায়ে ৮টি ক্যামোথেরাপি দেয়ার কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে ক্যান্সারের নিরাময়ে কার্যকরী ভূমিকা নেয়ায় মোট ১২টি ক্যামোথেরাপি দেয়া হয়। বেলভ্যু হাসপাতালের চিকিত্সক ড. জেইন এমআরআই, সিটি স্ক্যানসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ক্যান্সার বিভাগের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টিম গঠন করেন। সার্জিকাল অনকোলজি বিভাগের ডাক্তার জর্জ মিলার সমস্ত রিপোর্ট দেখে গত ৭ জুন অপারেশনের মাধ্যমে হুমায়ূন আহমেদের ক্যান্সার রোগ নিরাময় হওয়া সম্ভব বলে মত দেন। এ বছরের ১২ জুন অস্ত্রোপচারের তারিখ নির্ধারণ করেন চিকিত্সক। অপারেশনের আগে বাংলাদেশ ঘুরে আসার অনুমতি চাইলে চিকিত্সকরা লেখককে অনুমতি দেয়ার ৪৮ ঘন্টার মধ্যে তিনি বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। তার ইচ্ছা ছিল মায়ের সঙ্গে দেখা করে তার নুহাশ পল্লী ঘুরে গিয়ে অপারেশন করাবেন। চিকিত্সকরা অস্ত্রোপচারের ১০ দিন আগে লেখককে আমেরিকায় সুস্থভাবে ফিরে আসার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। অপারেশন ঠিকঠাকই হয়েছিল। কিন্তু অপারেশনের পর দেখা দেয় জটিলতা। এরপর আবারও অপারেশন করা হয়। এরপর থেকেই দেখা দেয় জটিলতা।
জীবনযুদ্ধে নানা দুঃখ-কষ্টের মুখোমুখি হতে হলেও লেখক হিসাবে তিনি প্রথম থেকেই বাংলার পাঠকের হূদয়ে স্থান করে নেন। নন্দিত নরকে, শংখনীল কারাগার এ দুটি উপন্যাস দিয়ে যাত্রা শুরু তার। এরপর গত চার দশকে তার জনপ্রিয়তা আকাশ স্পর্শ করেছে। তাকে ছাপিয়ে আর কোন লেখকই আজ পর্যন্ত পাঠকের মনে স্থান করে নিতে পারেনি। লেখক হিসাবে ঈর্ষণীয় অবস্থানে বিরাজ করছেন তিনি। শুধু উপন্যাস বা ছোট গল্প নয় সংস্কৃতির যে মাধ্যমে হাত দিয়েছেন জনপ্রিয়তা যেন তার পায়ে লুটোপুটি খেয়েছে। টিভি নাটক, চলচ্চিত্র এমনকি কবিতা রচনা সবকিছুই পাঠক পরম আদরে বুকে তুলে নিয়েছে।
অনন্য সব উপন্যাসের পাশাপাশি তিনি বাংলা সাহিত্যে সৃষ্টি করেছেন জনপ্রিয়তম দুটি চরিত্র ‘হিমু’ ও ‘মিসির আলী’। তার উপন্যাসের পাশাপাশি এ দুটি চরিত্রও তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাংলা সায়েন্স ফিকশন রচনাতেও তিনিই পথিকৃত্। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা আড়াই শতাধিক। অতুলনীয় জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও তিনি অন্তর্মুখী চরিত্রের এই মানুষটি অনাড়ম্বরভাবে চলাফেরা করেন। তার বেশ কিছু গ্রন্থ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বেশ কিছু গ্রন্থ স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত।
হুমায়ূন আহমেদের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে। তার পিতা ফয়জুর রহমান আহমদ এবং মা আয়েশা ফয়েজ। তার পিতা একজন পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন এবং তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। তার অনুজ মুহম্মদ জাফর ইকবাল দেশের আরেক জনপ্রিয় সাহিত্যিক ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সবার ছোট ভাই আহসান হাবীব রম্য সাহিত্যিক এবং কার্টুনিস্ট। ছোট বেলায় হুমায়ূন আহমেদের নাম ছিল শামসুর রহমান; তার পিতা নিজ নাম ফয়জুর রহমানের সাথে মিল রেখে ছেলের নাম রাখেন শামসুর রহমান। পরবর্তীকালে তিনি নিজেই নাম পরিবর্তন করে হুমায়ূন আহমেদ রাখেন।
হুমায়ূন আহমেদের প্রথম স্ত্রীর নাম গুলতেকিন আহমেদ। তাদের বিয়ে হয় ১৯৭৩ সালে। প্রথম স্ত্রীর ঘরে তার তিন মেয়ে এবং দুই ছেলে জন্মগ্রহণ করে। তিন মেয়ের নাম বিপাশা আহমেদ, নোভা আহমেদ, শীলা আহমেদ এবং ছেলের নাম নূহাশ আহমেদ। অন্য আরেকটি ছেলে অকালে মারা যায়। ১৯৯০ সালে শীলা আহমেদের বান্ধবী এবং তার বেশ কিছু নাটকে অভিনয় করা অভিনেত্রী শাওনের সাথে হুমায়ূন আহমেদের ঘনিষ্ঠতা হয়। পরে ২০০৫ সালে গুলতেকিনের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের পর তিনি শাওনকে বিয়ে করেন। শাওনের ঘরে তার তিন সন্তান জন্মগ্রহণ করে। প্রথম কন্যাটি মারা যায়। পরের দুই ছেলের নাম নিষাদ হুমায়ূন ও নিনিত হুমায়ূন।
হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে বিএসসি ও এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়ন বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি লাভ করেন। তার কর্মজীবন শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীকালে তিনি অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে লেখালেখিতেই পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন। পাশাপাশি চলতে থাকে চলচ্চিত্র নির্মাণ, নাটক নির্মাণ।
এ পর্যন্ত অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: বাংলা একাডেমী পুরস্কার, শিশু একাডেমী পুরস্কার, একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ কাহিনী ১৯৯৩, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ১৯৯৪, শ্রেষ্ঠ সংলাপ ১৯৯৪), লেখক শিবির পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন পদক, বাকশাস পুরস্কার, হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, জয়নুল আবেদীন স্বর্ণপদক প্রভৃতি।
দেশের বাইরেও সম্মানিত হয়েছেন হুমায়ুন আহমেদ। জাপানের ‘NHK’ টেলিভিশন তাঁকে নিয়ে ‘Who is who in Asia’ শিরোনামে পনের মিনিটের একটি ডকুমেন্টারি প্রচার করে।
হুমায়ুন আহমেদের উল্লেখযোগ্য সাহিত্য
উপন্যাস: নন্দিত নরকে, লীলাবতী, কবি, শঙ্খনীল কারাগার, মন্দ্রসপ্তক, দূরে কোথায়, সৌরভ, নী, ফেরা, কৃষ্ণপক্ষ, সাজঘর, বাসর, গৌরিপুর জংশন, নৃপতি, অমানুষ, বহুব্রীহি, এইসব দিনরাত্রি, দারুচীনি দ্বীপ, শুভ্র, নক্ষত্রের রাত, কোথাও কেউ নেই, আগুনের পরশমনি, শ্রাবণ মেঘের দিন, বৃষ্টি ও মেঘমালা, মেঘ বলেছে যাবো যাবো, জোছনা ও জননীর গল্প প্রভৃতি।
চলচ্চিত্র: আগুনের পরশমনি, শ্যামল ছায়া, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, চন্দ্রকথা, নয় নম্বর বিপদ সংকেত। ইত্তেফাক

রাজীবনূর : ‘কোথাও কেউ নেই-এ বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হয়ে যাওয়ার পর রংপুরে মিছিল হয়েছিল বলে শুনেছিলাম। একদিন আমার খালা খবর দিল, শেষ পর্বটা আবার প্রচারিত হবে, যেখানে বাকের ভাইয়ের ফাঁসির রায় বদলে যাবে। আমি সেই পুনঃনির্মিত শেষ পর্বের আশায় অনেকদিন অপেক্ষায় ছিলাম। আমার ধারণা, আমার মতো আরো অনেকেই ছিল, যারা বাকেরের ফাঁসিটা মেনে নিতে পারেনি। একটা বানানো, মিথ্যা চরিত্র আমাদের সত্যিকারের জীবনে কিভাবে ঢুকে পড়েছিল! ঢুকে পড়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদও, আমাদের সময়ে। ৯০-এর দশকের মধ্যবিত্ত নাগরিকের চিন্তা, আবেগ, ভাষার বয়ান তৈরিতে হুমায়ূন শক্ত ভূমিকা রেখেছেন, কেবল তার বাজারচলতি উপন্যাস আর নাটক দিয়েই—ভেবে অবাক হই। হুমায়ূন ওই সময়টার একটা বিজ্ঞাপনও সম্ভবত। এসব লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে এপিটাফ লিখছি। অথচ লোকটা এখনও শ্বাস নিচ্ছেন। আশা করে আছি, বাকেরের মতো হুমায়ূনের জন্যও আরেকটা মিছিলের দরকার পড়বে না।’
কথাগুলো ফেসবুকে লিখেছিলেন তরুণ লেখক তানিম হুমায়ূন। তানিমের মতো আরো অগুণতি ভক্তের আকাঙ্ক্ষা এমনই ছিল, ভালো হয়ে ফিরে আসবেন তাদের প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন আহমেদ নিজেও বিশ্বাস করতেন ফিরে আসবেন তিনি। ব্যক্তিগতভাবে আমিও সেই প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। তবু মাত্র কয়েক দিন আগে তিনি যখন দেশে ফিরেছিলেন তখন ইত্তেফাকের ঈদসংখ্যার উপন্যাস চাওয়ার জন্য সহকর্মী আসিফুর রহমান সাগরকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম তাঁর ধানমণ্ডির বাড়ি দখিন হাওয়ায়। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন একটি উপন্যাসও যদি লিখতে পারেন তাহলে সেটি ইত্তেফাককে দেবেন। এখানে জানিয়ে রাখা ভালো ওই সময় স্যারের বাসায় উপস্থিত ছিলেন সমকাল পত্রিকার ফিচার এডিটর মাহবুব আজীজ ও তার অনুজ সহকর্মী সঞ্জয় ঘোষ।
তাকে বলেছিলাম, ‘স্যার, ইত্তেফাকের এবারের ঈদসংখ্যায় আমরা আপনার বাবার লেখা একটি গল্প, আপনার আম্মার আত্মজীবনীর খানিকটা, আপনার ভাগ্নি অপলা হায়দার এবং আপনিসহ আপনার দুই ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও আহসান হাবীবের লেখা ছাপাতে চাই।’ তিনি হেসে বলেছিলেন, ‘এত দেখছি হুমায়ূন আহমেদ ও তার পরিবার নিয়ে বিশেষ সংখ্যা করার মতো।’
স্যার উপন্যাস দেবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। তবু সংশয় ছিল অসুস্থতার জন্য যদি লিখতে না পারেন। তাই অনুজপ্রতীম গল্পগুকার মাসউদ আহমাদকে দিয়ে করিয়ে রেখেছিলাম একটি দীর্ঘ সাক্ষাত্কার। হুমায়ূন আহমেদের নিজের গড়া নন্দনকানন নুহাশ পল্লীতে তার সাম্প্রতিক লেখালেখি-সৃজনপ্রয়াস-পড়াশোনা-মৃত্যুভাবনা ইত্যাদি বিষয়ে পরপর দুদিন ধরে যে দীর্ঘ আলাপ করেছিলেন এখানে তার নির্বাচিত অংশ দেওয়া হলো, প্রিয় পাঠক বাকিটা পড়তে হলে ঈদসংখ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সম্ভবত এটিই হুমায়ূন আহমেদের দেওয়া শেষ সাক্ষাত্কার।
হুমায়ূন আহমেদ প্রায়ই তারাশঙ্করের কবি উপন্যাসের নায়ক কবিয়ালের জীবন এত ছোট কেনে আক্ষেপের কথা মনে করিয়ে দিতেন। সেই আক্ষেপই মাসউদের কাছে দেওয়া সাক্ষাত্কারে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি আরো আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘কচ্ছপের মতো একটা প্রাণীর এতবছর বাঁচার প্রয়োজন কী?”
‘স্যার, অল্প কিছুদিন পরে আপনি আবারও আমেরিকায় চলে যাবেন। এখন আপনি অনেকটা সুস্থ। এ মুহূর্তে আপনার কেমন বোধ হচ্ছে? আপনার ভক্তরা অপেক্ষায় আছে, আপনি কেমন আছেন তা আপনার মুখ থেকে শোনার জন্য…’ মাসউদ আহমাদের এ প্রশ্নের উত্তরে হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, ‘আমাকে দেখে তোমাদের কেমন লাগছে বলো। ভালো? ভালো লাগছে, তাই না? আমি আমেরিকায় ভালোই ছিলাম। আমি এ সমস্ত রোগ-ব্যাধি-অসুখকে জীবনে কোনোদিনই পাত্তা দেইনি। এখনো দিচ্ছি না। যেটা হওয়ার, হবেই। এটা নিয়ে হা-হুতাশ করে দুনিয়া মাতানোর তো কিছু নাই, আমি কিছু মাতাচ্ছি না। আমার ধারণা, আমি ভালোই আছি।’
‘অপারেশন নিয়ে ডাক্তাররা আর কিছু বললেন?’ জিজ্ঞেস করা হলে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমার মরার সম্ভাবনা কতটুকু? ডাক্তার আমাকে বললেন, তার নাম হচ্ছে জর্জ নীলা। তিনি কখনো রোগীর দিকে তাকান না, মাটির দিকে তাকিয়ে কথা বলেন। তিনি বললেন, তোমার অপারেশনটা যদি আমি করি তাহলে তোমার মরার সম্ভাবনা হচ্ছে শূন্য। জিরো পার্সেন্ট। এই সম্ভাবনা তো সংক্রমণের মতো। তবু দেশে এসে গাছপালা, মানুষ দেখে মুগ্ধ হচ্ছি। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়দের আদর পাচ্ছি এবং সর্বোপরি আমার মা তো আছেনই।’
‘আমেরিকায় গিয়ে কোন জিনিসটা আপনি বেশি মিস করেছেন?’ জানতে চাইলে হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, ‘তোমাদের একটা গল্প বলি। সত্যি গল্প। আমেরিকায় যাওয়ার পর, আমার মায়ের সারাজীবনের সঞ্চয় ডলার করে আমাকে পাঠিয়ে দিলেন হঠাত্ করে। তার সমস্ত সঞ্চয় হয়েছে পাঁচ হাজার পাঁচশ ডলার। এই টাকার বেশিরভাগই কিন্তু আমার পাঠানো। আমি মাসে মাসে অ্যালাউন্স দেই তাকে, সেটা জমিয়ে ব্যাংকে রাখে। এভাবে তার এই টাকাগুলো হয়েছে। আমাকে সবগুলোই পাঠিয়ে দিয়েছে। এ ডলারগুলো পেয়ে প্রথমে একটু রাগ উঠল মায়ের প্রতি। তার নিজের কাছে কোনো টাকা-পয়সা না রেখে সবটা পাঠিয়ে দিল?’ইত্তেফাক
- DRIVER CHARGED WITH MANSLAUGHTER IN DEADLY HIT-AND-RUN IN MARCH ON JAMAICA AVENUE
- নিউইয়র্কে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাংসদ অধ্যাপক সেলিম ভূঁইয়াকে সংবর্ধনা, কুমিল্লা বিভাগ শুধু সময়ের ব্যাপার
- UN General Assembly Adopts Bangladesh-Led Culture of Peace Resolution
- বাংলাদেশের উত্থাপিত ‘শান্তি ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি’ বিষয়ক প্রস্তাব গ্রহণ করল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ
- নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় জল খাবার রেস্টুরেন্ট এর গ্র্যান্ড ওপেনিং
- New York Attorney General James Secures $375,000 from 1-800-Flowers for Deceiving Consumers About Automatic Subscription Renewals
- নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে বাংলাদেশি আমেরিকা পুলিশ কর্মকর্তার নামে সড়ক ‘ডিটেকটিভ দিদারুল ইসলাম ওয়ে’
- ECOSOC recommends UN General Assembly to take decision on Bangladesh and Nepal’s LDC graduation extension requests