Friday, 23 October 2026 |
শিরোনাম
ওয়ার্ল্ড হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট ইউএসএর সাধারণ সম্পাদক ড. সাদিয়া আফরিন এরা চরমোনাই পীরের যুক্তরাষ্ট্র সফর উপলক্ষে নিউইয়র্কে দোয়া মাহফিল, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে বয়ান New York Attorney General James Secures Reimbursements for T-Mobile Customers Whose Rates Were Unjustly Raised নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে কুনু-ফিরোজ পরিষদের সাত দফা ইশতেহার ঘোষণা; কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, সাশ্রয়ী ফিউনারেল সেবা, বিমানের সরাসরি ফ্লাইট ও আর্থিক স্বচ্ছতায় অঙ্গীকার ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের পূর্ণ সমর্থন: জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত আইরিন খান নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে প্রথমবারের মতো বিতর্ক, গুরুত্ব পেল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি New York Attorney General James Warns New Yorkers About AI-Generated Election Misinformation Ahead of November Elections Bangladesh calls for global treaty to protect victims of crimes against humanity নিউইয়র্কে জাতিসংঘে মুহাম্মদ নওশাদ জমির এমপি: মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রতিরোধে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সনদ প্রণয়নের আহ্বান সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্য গোপন করলে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রত্যাখ্যান, আবেদনপত্রে চাওয়া তথ্য সঠিক ও সম্পূর্ণভাবে দেওয়ার নির্দেশনা মার্কিন দূতাবাসের
সব ক্যাটাগরি

হুমায়ূন কি নুহাশ পল্লীতে সমাধিস্থ হতে চেয়েছিলেন?

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 126 বার

প্রকাশিত: August 1, 2012 | 2:17 PM

হুমায়ূন আহমেদ

গাজী কাশেম, নিউ ইয়র্ক  : ২৮ ফেব্র“য়ারি, ২০১২। চলছে গ্লোবাল ওয়ার্মিং। শীতের মাঝে বসন্তের আমেজ। এবার নিউ ইয়র্ক সিটিতে তুষারপাত হয়নি বললেই চলে। অন্য বছরের মতো সড়কের দু-ধারে কোনো বরফের স্তূপ নেই। বরফগলা পানি নেই। দিন ছোট, রাত শেষ না হতেই আবার রাত আসে। অন্ধকারে জীবন বেশি কাটে। আমার বাসা থেকে হুমায়ূন আহমেদের বাসা গাড়িতে মাত্র ৩ মিনিটের ড্রাইভ। পৌঁছে গেলাম সেই কোর্ট বিল্ডিংয়ের পেছনে অতি পরিচিত বাড়িতে। প্রধান ফটকের ধবল রঙের দরজা রাস্তার দিকে নুইয়ে আছে। দরজাটা টেনে ভেতরে আনলাম। দোতলায় উঠে গেলাম। দরজায় করাঘাত করতেই গৃহপরিচারিকা তিরমিজির কণ্ঠÑ ক্যাডা, ভিতরে আসেন, দরজা খোলা।

সোফায় বসে আছেন হুমায়ূনের শাশুড়ি তহুরা আলী। তাকে ইশারায় বললাম, স্যার কোথায়? তিনি হাতের ইশারায় দেখালেন, স্যার ভেতরের রুমে লেখালেখি করছেন। নিশাদ ছবি আঁকছে। পুরো লিভিং রুম নিষাদের আঁকা ছবিতে ছড়ানো-ছিটানো। আমার কণ্ঠ শুনতে পেয়ে শাওন রুম থেকে বের হয়ে এসে বললেন, ভাই একটা উপকার করবেন?

: জি বলেন?

: একটু গরুর কিমা লাগবে, কয়েকটা টমেটো লাগবে। হুমায়ূন সাহেব স্পাগাতি (নুডুলস, কিমা, টমেটো, রসুন দিয়ে রান্না) খেতে চেয়েছেন।

তাকিয়ে দেখলাম হুমায়ূন আহমেদ নামাজের বিছানায় বসেই লিখছেন। খুব দুর্বল শরীর। হুমায়ূন আহমেদের খাওয়া-দাওয়া একেবারে কমে গেছে। এখন তার রাত কাটে কয়েক লোকমা স্পাগাতি খেয়ে। কোনো খাবারই তিনি খেতে পারছেন না, শুধু অভিযোগÑ প্রত্যেক খাবারে শুধু গন্ধ। ঘর থেকে প্রায় ৭০০ ফুটের পর বাংলাদেশি গ্রোসারি ‘কাওরান বাজার’। কিমা আর টমেটো কিনে আমার আবার গৃহে প্রবেশ।

হুমায়ূন আহমেদ শোয়ার ঘরটা ছেড়ে ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে এসে বসলেন।

সালাম দিলাম।

: ওয়ালাইকুম সালাম।

মুখে তেমন একটা হাসি নেই। নীরব। নিনিত এসে হু-হু করছে তার কোলে উঠতে। আমাকে বললেন, নিনিতকে একটু ধরো। তিনি বেশ নীরব। ফ্যাল ফ্যাল করে জানলার কাচের দিকে তাকিয়ে আছেন।

: স্যার দাবা খেলবেন?

মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, না।

দিনে দাবা খেলেছেন, রাতে আর খেলবেন না। তারপরও দাবা ঘরটা এনে সামনে রাখলাম। নীরব। এমন নীরব তাকে পূর্বের দিনগুলোয় কখনো আমি দেখিনি। নীরবতার কারণ ছিল ভিন্ন, আগামীকাল ২৯ ফেব্র“য়ারি। মাজহার সাহেব দেশে চলে যাবেন, তার কয়েকদিন পর শাওনের মা-ও চলে যাবেন। ১ মার্চ থেকে স্লোন ক্যাটারিংয়ে আর চিকিৎসা নিচ্ছেন না। ২ মার্চ থেকে সিটি হাসপাতাল বেলভ্যুতে ট্রিটমেন্ট শুরু হবে। (বেলভ্যু হাসপাতাল আর স্লোন ক্যাটারিং হাসপাতালের পার্থক্য, যেমন ঢাকা মেডিকেল কলেজ আর এ্যাপোলো হাসপাতাল)। অন্য দিকে কোনো কিছুই খেতে পারছেন না। আমাদেরকে জানালেন, ‘একি হল, যে গরুর মাংস আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল, এখন তার গন্ধ নিতে পারছি না, রেড মিট খাওয়া খুবই দরকার, আমার ব্লাডে রেড সেল খুবই কম। আল্লাহপাক সবই আমার কিসমত থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।’ এ ধরনের একটা কষ্ট তার মনটাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছিল। চোখ দুটিতে প্রচণ্ড কষ্ট। তিনি উঠে গিয়ে ছোট ঘরটায় ঢুকলেন, যে কক্ষটায় মাজহার সাহেব থাকেন। আমিও সাথে ঢুকলাম।

আমরা মুনিয়া মাহমুদ এবং মো. নুরুদ্দিনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। রাত তখন ১১টা। মুনিয়া মাহমুদ এবং মো. নুরুদ্দিন এলেন।

৫ জনের আসর। গল্প চলছে। হুমায়ূন আহমেদ আজ তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা আহসান হাবিবের গল্প জুড়ে দিলেন, বললেন, শুনবে আমার ছোট ভাই আহসান হাবিবের এক কাণ্ড। গ্রামীণ ব্যাংকে ওর একটা চাকরি হয়েছিল। কোনো এক প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল। কয়েকদিন না যেতেই সে চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে বাড়ি চলে এলো। কীরে, কী হল, চাকরি ছাড়লি কেন? আহসান হাবিব বলল, সকালে নাস্তার অসুবিধা হয়Ñ এই কারণে চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছি। এ নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ বেশ হাসলেন, বললেন, ও সকালের নাস্তার জন্য চাকরি ছেড়ে দিয়ে এসেছে। তারপর নুহাশ পল্লীর গল্প শুরু হল।

এক পর্যায়ে মুনিয়া মাহমুদ বললÑ স্যার, আমাকে একটু নুহাশ পল্লীতে জায়গা দেবেন? হুমায়ূন আহমেদ বললেন, নূহাশ পল্লী তো কবরস্থান না। মুনিয়া মাহমুদ বলছিল যাতে সে সেখানে বেড়াতে যেতে পারে, আড্ডা দিতে পারে সেই কারণে।

মাজহার বললেন, কাশেম ভাই শুনেন, আরেক ঘটনা। স্যারের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমার মাধ্যমে বললেন, নুহাশ পল্লীতে তাকে একটু জায়গা দিতে। স্যার বললেন, এটা কি কবরস্থান? তিনি মুনিয়া মাহমুদকে এটাও বললেন, আমি চাই না, নুহাশ পল্লীকে বা আমার কবরটাকে মাজার বানাতে। তিনি পাবলিক লাইফের চেয়ে প্রাইভেট লাইফে বেশি বিশ্বাস করতেন। আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রেও তাই থাকতে চেয়েছিলেন বলে আমার মনে হল।

এই গল্পের পর হুমায়ূন আহমেদ বললেন, আমার ছোট ভাই আহসান হাবিবের আরেকটা মজার কাণ্ড শোনো। তোমরা তো জানো ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে আমার বাবা শহীদ হন। আমরা তখন পিরোজপুরে থাকতাম। আহারে, আমার বাবা জীবনে কোনোদিন আমাদের উপর হাত ওঠাননি। একটা বকাও দিতেন না। আমি চেয়েছিলাম বাবার কবরটা পিরোজপুর থেকে নুহাশ পল্লীতে নিয়ে আসতে। মা মারা গেলে বাবার পাশে মাকেও সমাধিস্থ করতে। এই ব্যাপারে আমার ভাই-বোনদের সাথে আলাপ-আলোচনা করলাম। তারা কেউ আমার এই প্রস্তাবে রাজি হল না। আমার ছোট ভাই আহসান হাবিব কী বলল জানো? বলল, আমরা যদি বাবার কবরটা পিরোজপুর থেকে ঢাকায় নিয়ে আসি তাহলে সেই পিরোজপুরের খালি কবরটা কী করব? সেখানে কি আমরা লিখে রাখব ‘টু-লেট’Ñ কবর ভাড়া দেয়া হবে। এ বলে অনেকক্ষণ হাসলেন।

মার্চের শেষে অথবা এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে কোনো এক সন্ধ্যায় হুমায়ূন আহমেদ কেমোথেরাপির যন্ত্রণায় আমাকে বললেন, মাজহারকে ফোন দাও। বাংলাদেশ সময় তখন সকাল। আমি মাজহারকে ফোন দিলাম। পাশে শাওন এবং শাওনের মা। ডায়লগটা ছিল এইÑ

‘মাজহার, ৮টা কেমো শেষ হয়ে গেছে, এখন ডাক্তাররা আরো ৪টা কেমো দিতে যাচ্ছে, এটা তো আমার শরীর নাকি, তুমি আমাকে দেশে নিয়ে যাও। আমি নুহাশ পল্লীতে থাকতে চাই, নুহাশ পল্লীতে আমি মরতে চাই।’

হুমায়ূন আহমেদ ক্লিয়ার কোনো ইঙ্গিত আমাদের সামনে দেননি যে তার মৃত্যুর পর কোথায় তাকে সমাধিস্থ করা হবে। এত তাড়াতাড়ি তাকে অন্ধকার গ্রহে চলে যেতে হবে, এটা তিনি ভাবতে পারেননি। যেখানে স্লোন ক্যাটারিংয়ের বিখ্যাত অনকোলজিস্ট বলেছেন, তুমি ২ থেকে ৪ বছর বাঁচবে। তিনি প্রথমটাই ধরে নিয়েছিলেন। দু বছর। সেই কারণেই অপেক্ষা চলছিল এবং এই সময়ের ভেতরে আরো কিছু কাজ করে যেতে চেয়েছিলেন।

৩০ জুন, রোববার। বেলা ২টা হবে। ম্যানহাটন ডাউন টাউন। ১৪ নং স্ট্রিট এবং ইউনিয়ন স্কয়ারের মোড়। আমার গাড়িতে করে আমি, পূরবী বসু, শাওন এবং মাজহার ওখানে পৌঁছি। ‘বেস্ট বাই’ দোকান থেকে একটা ভয়েস-রেকর্ডার কেনা হয়। হুমায়ূন আহমেদের শেষ কথাগুলো রেকর্ড করার জন্য। মনে হয় তা আর হয়ে ওঠেনি। তখন মাজহার আর শাওন স্বপ্নের ঘোরে বাস করছিলেন। আমি যা দেখেছি-বুঝেছি তার অবস্থা দেখে মনে হয়েছিল তিনি ২৮-২৯ জুন থেকে লাইফ সাপোর্টে চলে যান। যদি সেই সময়ে তিনি লাইফ সাপোর্টে না যেতেন, তাহলে তার শেষ ইচ্ছাগুলো অনায়াসে রেকর্ড করা যেত। আজ তার দাফন নিয়ে এত জটিলতা দেখা দিত না।

বিজ্ঞাপন / স্পন্সরড কন্টেন্ট
ট্যাগ:
সর্বশেষ সংবাদ