কবি কাজী জহিরুল ইসলামের ৫০তম জন্মদিনে নিউইয়র্কে শিল্পানুরাগীদের ফুলেল শুভেচ্ছা
নিউইয়র্ক : বাংলা ভাষার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কবি কাজী জহিরুল ইসলাম ১০ ফেব্রুয়ারী পঞ্চাশে পা দিয়েছেন। এ উপলক্ষে “ঊনবাঙাল” গত ১১ ফেব্রুয়ারী শনিবার কবিকে ঘিরে আয়োজন করে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালার। সন্ধ্যা ছয়টায় জ্যামাইকার স্টার পার্টি হলে নিউ ইয়র্কের শিল্পানুরাগী মানুষের ঢল নামে কবিকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে। কবির প্রিয় একটি রবীন্দ্র সঙ্গীত “আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে” পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। সঙ্গীত পরিবেশন করেন মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী শফি চৌধুরীর নেতৃত্ব সূতপা সাহা এবং শিশু শিল্পী গুঞ্জরী। এরপর “কবির মুখোমুখি” শিরোনামে ত্রিশ মিনিটের একটি সাক্ষাৎকার পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। সাংবাদিক শামীম আল আমিন কবি কাজী জহিরুল ইসলামের মুখোমুখি হন এ পর্যায়ে। সাক্ষাৎকার শেষে দর্শকরা কবিকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। এতে অংশ নেন সাংবাদিক কৌশিক আহমেদ, সাংবাদিক আনওয়ার হোসেইন মঞ্জু, রাজিয়া নাজমী, এজাজ আলম, আরিফ মাহমুদ শৈবাল প্রমূখ। এরপর কবির বেড়ে ওঠা এবং তাঁর জীবনের নানান ঘটনাবলী নিয়ে নির্মিত একটি প্রামান্যচিত্র প্রদর্শিত হয়, পিনড্রপ নীরবতায় হলভর্তি দর্শক তা উপভোগ করেন। প্রামান্য চিত্রটি নির্মাণ করেন শামীম আল আমিন, নেপথ্য কন্ঠে ছিলেন আবৃত্তি শিল্পী নজরুল কবীর। প্রামান্য চিত্রটির মধ্য দিয়ে দর্শকরা আরো একবার নিশ্চিত হন বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতার অভিঘাতে সমৃদ্ধ এক কবি কাজী জহিরুল ইসলাম। এরপর শুরু হয় ফুলেল শুভেচ্ছা পর্ব। কবিকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান অসংখ্য ভক্ত, গুণগ্রাহী শিল্পানুরাগী মানুষ। এ পর্যায়ে সকলের পক্ষ থেকে কবিকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন বর্ষীয়ান সঙ্গীতগুরু মুত্তালিব বিশ্বাস । এ সময় মুহুর্মুহু করতালিতে ফেটে পড়ে স্টার পার্টি হল। ছড়াকার মামুন জামিলের কিশোরী কন্যা তিরু কবির একটি প্রতিকৃতি এঁকে কবিকে উপহার দেন এই পর্বে। এরপর শুরু হয় কবির কবিতা থেকে আবৃত্তি এবং শুভেচ্ছা বক্তব্যের পালা। আবৃত্তি করেন উত্তর আমেরিকার জনপ্রিয় আবৃত্তিশিল্পী ক্রিস্টিনা রোজারিও, ক্লারা রোজারিও, নজরুল কবীর, নজরুল ইসলাম, আনওয়ারুল লাভলু, গোপন সাহা, মিজানুর রহমান প্রধান, শুক্লা রায়, পারভীন সুলতানা, শাহরীন মঞ্জুর, রীপা নূর, নাসিমা সুলতানা প্রমূখ। কবিকে নিবেদিত কবিতা পাঠ করেন লালন নূর এবং রওশন হাসান। অনুষ্ঠানের মূল আলোচক ছিলেন কবি সৈয়দ কামরুল এবং সাংবাদিক কৌশিক আহমেদ। অন্যানের মধ্যে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন, জাতিসংঘের সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল নুরুল আলম, ছড়াকার শাহ আলম দুলাল, রাজিয়া নাজমী, মুক্তিযোদ্ধা ফকির রহমান, সাংবাদিক আহমেদ মূসা, সাবেক সংসদ সদস্য লিয়াকত আলী, সনম টিভির স্বত্বাধিকারী খন্দকার তৌফিক কাদের, নিলুফার রেজা, শিল্পী শফি চৌধুরী হারুন, গোলাম সরওয়ার হারুন, কবি সালেম সুলেরী, এজাজ আলম, আরিফ মাহমুদ শৈবাল, কবিপুত্র কাজী আবরার জহির অগ্নি, ছড়াকার মামুন জামিল প্রমূখ। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন জনপ্রিয় সাংবাদিক শামীম আল আমিন। সাংবাদিক কৌশিক আহমেদ বলেন, কবি কাজী জহিরুল ইসলাম আমাকে চারবার চমকে দিয়েছেন। আজ থেকে তিন বছর আগে কবি শহীদ কাদরীর “একটি কবিতা সন্ধ্যা”য় এক সুদর্শন, স্মার্ট যুবক একটি কবিতা পড়েন, কবিতার নাম, “বাড়ি আছো?”। হল ভর্তি দর্শক বিস্ময়ে হতবাক। কী অসাধারণ কবিতা। পাঠ শেষে সকলে ঘিরে ধরেন তাঁকে। আমি এগিয়ে গিয়ে বলি, আমি কি আপনার কবিতাটি আমার কাগজে ছাপতে পারি? তিনি খুব বিনয়ের সাথে বলেন, এটিতো আমার বইয়ে ছাপা হয়ে গেছে। নিজেকে খুব মূর্খ মনে হলো। এমন অসাধারণ কবিতা যিনি লিখেন তাঁর বই আমি পড়িনি! দ্বিতিয়বার তিনি আমাকে চমকে দেন, যখন দেখি একটি অনুষ্ঠানে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি তাঁর স্পেশাল নিড কন্যাকে সামলাচ্ছেন হাসি মুখে। এই দীর্ঘ সময়ে একবারের জন্যেও তাঁর কপালে আমি বিরক্তির ভাঁজ দেখিনি। তৃতীয়বার আমি চমকে উঠি যখন দেখি তিনি “ঊনবাঙাল” শব্দের আবিস্কারক। এই নামে জন্ম নিয়েছে একটি সাহিত্যসংগঠন। আমি “বাঙালী” পত্রিকা করি, গর্ব করে বলি আমি বাঙালী, অথচ তিনি কতটা বিনয়ী, বলছেন আমি “ঊনবাঙাল”। এই যে একটি নতুন শব্দ তিনি বাংলা ভাষায় যোগ করলেন, এর জন্য কি বাংলা ভাষা তাঁর কাছে ঋণী হয়ে থাকবে না? চতুর্থবার আমি চমকে উঠি যখন দেখি তিনি বাংলা কবিতা থেকে ক্রিয়াপদ তুলে দিয়ে লিখছেন ক্রিয়াপদহীন কবিতা। এও কী সম্ভব? ক্রিয়াপদ নেই, অথচ শুদ্ধ, সাবলীল কবিতা! একটি, দুটি নয়, তিনি লিখেছেন অসংখ্য এবং শুধু ক্রিয়াপদহীন কবিতা দিয়েই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর এবং বাংলা ভাষার প্রথম ক্রিয়াপদহীন কবিতার বই, “ক্রিয়াপদহীন ক্রিয়াকলাপ”।
কবি সৈয়দ কামরুল বলেন, কবির পঞ্চাশতম জন্মজয়ন্তি একটি মাইলস্টোন যেখানে তিনি দাঁড়ান স্থিতধী, পেছন ফিরে তাকান অতিক্রান্ত শিল্পালোকে, পর্যালোচনা করেন তার সৃষ্টির উৎকর্ষ ও অসম্পূর্ণতা। রবীন্দ্রনাথ পঞ্চাশতম জন্মদিন পালন করেন আত্মমগ্ন হয়ে। এর আগে বলতেন, কতো পঁচিশে বোশেখ গেল তাকে অন্য সব তারিখের মতো মনে হয়েছে। তবে কেন পঞ্চাশে এসে জয়ন্তিতে মগ্ন হলেন? পরের পঞ্চাশে যেন ঘাটতি পূর্ণ হয়, পূর্ণতার দিকে যাওয়া যায়। কবি কাজী জহিরুল ইসলামকেও মিল্টনের মতো বলতে হবে, হাউ মাই লাইট ইজ স্পেন্ট! তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে পাঠক-প্রিয় কবিতা না কবিতা-শিল্প নির্মাণ, কোন দিকে হবে তার পরবর্তী পঞ্চাশের যাত্রা। কবি কাজী জহিরুল ইসলাম একজন জীবন্ত কবি, কবিতায় তিনি নিরন্তর, নিয়ত, প্রতিনিয়ত; যেন এক লিভিং ভলকানো, সারাক্ষণ উদগীরণরত। তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, কবি কাজী জহিরুল ইসলাম বাংলা কবিতাকে সমৃদ্ধ করবেন নিজস্ব কবিতার ঐশ্বর্যে।
নুরুল আলম বলেন, একজন মানুষকে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে রেখে বিশ্লেষণ করলে জানা যাবে তিনি কতটা সফল। পেশাগত জীবন, পারিবারিক জীবন, মানবিক জীবন এবং নান্দনিক জীবন, কবি কাজী জহিরুল ইসলাম এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাবলীল এবং সফল। আমি তাঁর আরো সাফল্য দেখার জন্য তাকিয়ে থাকবো।
মুত্তালিব বিশ্বাস কবিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, আমি কবিকে এবং তাঁর কবিতাকে ভালোবাসি, যেমন এক সময় ভালোবেসেছিলাম কবি আল মাহমুদের কবিতা।
কবি কাজী জহিরুল ইসলাম তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে সমবেত শুভান্যধ্যায়ীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। বিশেষ করে গোপন সাহা, শামীম আল আমিন, স্বপ্ন কুমার, আশরাফুন নাহার লিউজা, ফেরদৌস নাজমী, নজরুল কবীর এবং তাঁর স্ত্রী মুক্তি জহিরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান, যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এই বিশাল আয়োজন সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতিতেই জন্মদিন উদযাপনের রেওয়াজ আছে। মানুষ প্রতিদিন তাঁর জীবন থেকে সময় হারিয়ে ফেলছে, এই কথাটি জন্মদিনের দিনই বেশি করে মনে পড়ে। তিনি যেন এতে বিষণ্ণ হয়ে না পড়েন সেজন্যই প্রিয়জনেরা এই দিনে তাঁকে ঘিরে আনন্দ করতে থাকে। তিনি আরো বলেন, মানুষ ক্রমশ বদলাতে থাকে। বদলায় বলেই সে বেঁচে আছে। যে মানুষ বদলায় না সে মরে গেছে। এখন কথা হচ্ছে এই বদল কতটা মানুষের কল্যাণের পক্ষে যায় সেটিই বিবেচ্য। আমি প্রতিদিন একটু একটু করে মানুষ হওয়ার চেষ্টা করছি। এই বিপুল ভালোবাসা আমার দায়িত্ববোধ বাড়িয়ে দিয়েছে, আমাকে আরো ভালো কাজ করতে হবে, এটিই কেবল মনে হচ্ছে।
কবিপত্নী মুক্তি জহির সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে এই পর্বের সমাপ্তি টানেন। এরপর জন্মদিনের গান গেয়ে কেক কাটা হয়। এ সময়ে প্রথমে উপস্থিত শিশু-কিশোররা কবিকে ঘিরে ধরেন। পরে অন্যরাও উৎসব মুখর পরিবেশে কবির সঙ্গে ছবি তোলেন।
নৈশভোজের পরে গান গেয়ে শোনান মুত্তালিব বিশ্বাস, শফি চৌধুরী এবং তানভীর শাহীন।
- নিউইয়র্কে অ্যাসাল ওজোন পার্ক চ্যাপ্টারের ইফতার ও অভিষেক
- নিউইয়র্কে বাংলাদেশ ল সোসাইটি ইউএসএ’র ইফতার মাহফিল: খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার আহ্বান
- BOROUGH PRESIDENT GIBSON HOSTS FOURTH ANNUAL BRONX IFTAR DINNER DIALOGUE UNDER THE THEME “UNITY IN DIVERSITY”
- নিউইয়র্কে মানসিক সংকটে থাকা যুবককে গুলি: পুলিশ প্রশিক্ষণ এবং মানসিক সংকটসংক্রান্ত ৯১১ কল
- নিউইয়র্কে গ্রী ম্যাকানিকেল ইয়াঙ্কার্স এর ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গমাতা পরিষদ’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- নিউইয়র্কে ঢাকা জেলা অ্যাসোসিয়েশনের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
- বাংলাদেশ সোসাইটি অব ব্রঙ্কস নিউইয়র্ক ইনকের কোরআন তেলাওয়াত প্রতিযোগিতা ও ইফতার মাহফিল








