কবি আলেয়া চৌধুরীর প্রয়ান যেন দ্বিতীয়বার মাকে হারালাম
মনিজা রহমান : ২০১৯ সালে ১৭ ফেব্রুযারি আমার মায়ের মৃত্যুর পরে ৩ আগস্ট সোমবার আরেকটি বিনিদ্র রাত কাটালাম। আমার আরেকজন মা আলেয়া চৌধুরী চলে গেলেন এই দিন।

রক্তের সম্পর্ক নেই, আত্মীয়তার বন্ধন নেই, এমন একজন মানুষের প্রস্থানে এত বেদনাবোধ করব কখনও ভাবতে পারিনি। আলেয়া চৌধুরীকে আমি আপা বলে ডাকতাম। কিন্তু তিনি যেন ছিলেন আমার দ্বিতীয় মা। গত বছর আমার আপন মায়ের মৃত্যুর পরে এক মাসের বেশী সময় আমি ট্রমার মধ্যে ছিলাম। ওই সময় প্রায়ই আলেয়া আপা ফোন করতেন। আমি অনেক সময় মানসিক বিপর্যয়ের কারণে ফোন ধরতে পারতাম না। কিন্তু উনি তাতে রাগ করতেন না। উল্টো মেসেজ রাখতেন-’ আমি জানি তোমার মনের অবস্থা ভালো না। যে কারণে ফোন ধরছ না। তুমি না ধরলেও আমি তোমাকে ফোন করবই।’ আর বলতেন…

উনি বলতেন, ’ভাববে আমি তোমার মা। যখন মন খারাপ হবে আমাকে ফোন করবে।’আসলে রাগ-অহংকার-শাসন কোন কিছু তার মধ্যে পাইনি। তিনি যেন শ্বাশত মায়ের মতোই ছিলেন একটি বহতা নদী। এমন নি:স্বার্থভাবে আমাকে ভালোবাসতে কাউকে দেখিনি। যে কারণে মনের মধ্যে একটা দায় তৈরী হয়েছিল।
আলেয়া আপা জীবনের শেষ ইচ্ছা ছিল, কেউ একজন ওনার আত্মজীবনী লিখুক। এজন্য বারবার বলতেন আমাকে। মার্চের মাঝামাঝি সময়ে যখন নিউইয়র্কে করোনা ভাইরাস মহামারী শুরু হল আমরা সবাই গৃহবন্দী হয়ে গেলাম। লকডাউনের ওই সময়টা মনে হল, আলেয়া আপার সঙ্গে কথা বলি। করোনা আতংকের প্রাথমিক ধাক্কা সামলে ওনার সঙ্গে কথা বলা শুরু করলাম। উনি কথা বলতেন, আমি লিখতাম। মাঝে মধ্যে এমনি আলাপও হত। আমি বলতাম –’আপা, আজকে কি করলেন ?’ আলেয়া আপা বলতেন- ‘ কি আর করব ? শরীরটা ভালো ছিল না। ডাক্তারকে ফোন করলাম। ওষুধ দিল। কিন্তু ফার্মেসিতে আনতে যাবে কে ?’ আবার কখনও জিজ্ঞাসা করতাম- ‘ আপা, আজকে কি রান্না করেছেন ?’ আলেয়া আপা উত্তর দিতেন- ‘কালকে খিচুড়ি আর ডিম ভুনা করেছিলাম। সেটাই খেলাম। অল্প করে তো রান্না করা যায় না। একবার রান্না করে কয়েকবার খেতে হয়।’

কথা দিয়েও নিয়মিত কথা বলা হত না আলেয়া আপার সঙ্গে। নিজের সামার স্কুল, ছেলের সামার স্কুল, সংসারের নানা কাজ, ভার্চুয়াল নানা আয়োজন, আরো সব অনেক কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম। সেই উত্তরের চর্থা গ্রাম থেকে ঢাকা শহর, সেখান থেকে ইরান-জর্ডান-জার্মানী হয়ে মাছ ধরা ট্রলারে করে আমেরিকায় আসা, তারপর একটি গ্রীনকার্ড পাবার জন্য আকুল আকাঙ্খা- কোন কিছু বাদ গেল না সেই কথোপকথনে। আলেয়া আপা একাই লড়াই করেছেন সারাজীবন। কোন সঙ্গী পাননি পাশে। কেউ না। দুই বার ওনার শুভাকাঙ্খীরা উদ্যোগ নিয়েছিল ওনাকে সংসারী করার। কিন্তু হয়নি। এই নিয়ে শেষ জীবনে কিছুটা হতাশা ছিল। অন্তত একজন সঙ্গী থাকলে হয়ত এভাবে বাথরুমে একা মরে পড়ে থাকতে হত না। কেউ নিশ্চয়ই সঙ্গে সঙ্গে খবর দিত হাসপাতালে। কিন্তু হায়রে নিয়তি….

৪ আগস্ট মঙ্গলবার যখন লেখাটা লিখছি, তখন নিউইয়র্কের প্রকৃতিতে ঝড় ও প্রবল বৃষ্টিপাতের দাপট। লন্ডভন্ড চারদিক। যেন আমার মনের অবস্থাই বলছে প্রকৃতি! এমন সংগ্রামী একজন মানুষ, যিনি সারাজীবন অকল্পনীয় লড়াই করেছেন ভাগ্যবদলের জন্য, জীবন তাকে বারবার বিমুখ করলেও নিয়তির বিরুদ্ধে আবার তিনি রুখে দাঁড়িয়েছেন- এমন একটি মানুষের জীবন অবসান কি করে এত আচমকা হয়! উনি ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন দীর্ঘদিন। ২৯ জুলাই বুধবারও ওনার দুটি টেস্ট ছিল। তার আগের দিন ২৮ জুলাই ও ৩০ জুলাই দীর্ঘ সময় কথা হয়েছে ওনার সঙ্গে। কিন্তু একবারের জন্য মনে হয়নি- উনি চলে যেতে পারেন! একবারের জন্য মনে হয়নি ওনার মৃত্যু এত সন্নিকটে। ৩ আগস্ট সোমবার রাতে যখন ওনার মৃত্যু সংবাদ শুনলাম, হাত-পা বরফের মত ঠান্ডা হয়ে গেল। কেমন যেন জ্বরগ্রস্ত লাগছিল। সারা মুখ তিতা বোধ হচ্ছিল। শরীরের প্রত্যেকটি স্নায়ু যেন অবশ হয়ে আসছিল। মনে হয় আমারই সত্তার কারো মৃত্যু হল।
স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে বহু কিছুর সাক্ষী ছিলেন আলেয়া চৌধুরী। বহু কিছু জানতেন। বহু পথ পাড়ি দিয়েছেন। নানা খানাখন্দে পড়েছেন। তবে কখনও জীবন বিমুখ হননি। কোনদিন কারো সম্পর্কে নেতিবাচক কোন শব্দ উচ্চারণ করেননি। কেউ ওনার সম্পর্কে দুই লাইন ভালো বললে শিশুর মতো খুশী হতেন। চাইতেন ওনাকে নিয়ে সবাই বলুক, লিখুক। আসলে বেঁচে থাকতে আমরা ওনার মুল্যায়ন করতে পারিনি। আরো বহুকিছু নেবার ছিল, নিতে পারিনি। আরো বহু কিছু জানার ছিল, জানতে পারিনি। ওনাকে নিয়ে শ্রদ্ধেয় আবেদীন কাদের ভাইয়ের একটা লেখার কথা উল্লেখ করতে ৩০ জুলাই রাতে ফোন করেছিলেন আলেয়া আপা। তারপর, কথায় কথায় অনেক কথা হল। ঈদের দিন গেন্ট্রি পার্কে আমার স্কুল বন্ধুদের গেট টুগেদার, আমি মিক্সড ভেজিটেবল আর স্যামন ফিশ ফ্রায়েড রাইস নিয়ে যাব। এজন্য অনেক সবজি কাটতে হবে। আমি সেসব কাটতে কাটতে প্রায় দেড় ঘন্টা কথা বললাম। আলেয়া আপা একবার ফোনে কথা শুরু করলে আর থামতেন না। আসলে একাকী নিঃসঙ্গ জীবনে কাছের মানুষদের সঙ্গে ফোনে কথা বলা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না ওনার।
আলেয়া আপার পুরো জীবনটাই ছিল যেন এক বিশাল পটভূমির উপন্যাস। কিংবা শত শত ছোট গল্পের সমষ্টি। অথবা কোন মহৎ সিনেমার উপজীব্য। ওই রাতে তিনি বলছিলেন -রওশনের কথা। আলেয়া আপারা আপন ভাইবোন ছিলেন সাতজন। আর রওশন ছিলেন ওনার ধর্মবোন। সেই হিসেবে আট ভাই বোন। রওশনের কথা মনে আছে ? ওই যে বাসচালকের মেয়ে! নয় বছর বয়সী শিশু আলেয়া যখন গ্রাম থেকে পালিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে খেয়ে না খেয়ে জীবন কাটাচ্ছিলেন, তখন এক বাসচালক তাকে বাড়িতে নিয়ে যান। বাড়ি মানে শাহজাহানপুর বস্তি। বাসচালকের এক মা মরা মেয়ে ছিল, যার নাম রওশন। বাড়িতে আর কেউ ছিল না বলে রওশনের বাবা দুই কন্যাকে নিয়েই বাস চালাতেন। একদিন বাস চালানা অবস্থায় হার্ট এ্যাটাক করেন রওশনের বাবা। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু। সুখ যেন সহ্য হয় না আলেয়ার। ক্রন্দনরত দুই শিশুকে পথচারীরা সলিমুল্লাহ এতিমখানায় নিয়ে আসেন। সেখানে তিন মাস থাকাকালীন আলেয়ার বারবার মনে হত, আমার তো বাবা-মা জীবিত, তবে কেন এতিমখানায় থাকব ? এরপর তিনি সেখান থেকে বের হয়ে পত্রিকার হকারী শুরু করলেন। তারপর অনেককিছু……।
আলেয়া আপা ছোট বেলা থেকে ছিলেন বেটে, গায়ের রঙ শ্যামলা। যেটাকে নিজের জন্য সুবিধা মনে করতেন। পুরুষ মানুষের লোলুপ দৃষ্টিতে পড়তে হত না। কিন্তু রওশন দেখতে ফর্সা ও লম্বা ছিলেন। যে কারণে আলেয়াকে অনুসরণ করে রওশনের পক্ষে এতিমখানা ছাড়া সম্ভব হয়নি। ওখান থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন। পরে আলেয়া আপার আর্থিক সাহায়্যে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। চাকরী নেন। একজন হৃদয়বান মানুষের সঙ্গে বিয়ে হয় রওশনের। তাদের একমাত্র ছেলে মালয়েশিয়ায় পড়াশুনা করে। বোন রওশনের জীবনের প্রাপ্তিকে নিজের প্রাপ্তি বলে মনে করতেন আলেয়া আপা। আসলে তিনি শুধু একভাবে সবার জন্য করে যেতেন। কোন প্রতিদান আশা করতেন না। নিজের বাড়িতে পাকা ঘর করেছেন, ভাইবোনদের মানুষ করেছেন, ধর্মবোনকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, এক ভাইকে আমেরিকায় আনার ব্যবস্থা করেছিলেন- নিজের সর্বস্ব উজাড় করে শুধু দিয়ে গেছেন।
এ বছর ৫ মার্চ প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা আয়োজিত নারী দিবসের অনুষ্ঠানে আলেয়া আপা এসেছিলেন আমার দাওয়াত পেয়ে। কয়েকদিন পরেই যে আমার জন্মদিন, আলেয়া আপার মনে ছিল। আসল আমার জন্মদিনের তারিখটা হাতে গোনা যে দুই একজন মানুষ মনে রাখতো আলেয়া আপা তাদের একজন। উনি আমার জন্য কার্ড, ফুল, শাড়ি, জুয়েলারি – কত কি নিয়ে এসেছিলেন। পারলে হৃদয়ের যতটুকু উত্তাপ সবটুকু দিয়ে দেন। প্রতিদানে কিছুই দিতে পারলাম না। আপার ইচ্ছা অনুযায়ী ওনার জীবনী লেখা শুরু করতে পারলাম না। অন্তত এক পর্ব লিখেছি, সেটা দেখে যেতে পারলেও উনি খুশী হতেন। কিন্তু, তখন কি ভেবেছি, মৃত্যু ওনাকে ডাকছে….ভাবিনি, সত্যি ভাবিনি।
আলেয়া আপার জন্মের আগে ওনার বাবা চট্টগ্রামে বাজি মস্তানী পীরের দরগায় মানত করেছিলেন- যেন ছেলে হয়। কিন্তু হল মেয়ে। কিন্তু মেয়ে হয়েই পুরো সংসারকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। শিশু আলেয়ার বয়স যখন এক-দেড় বছর, পেটটা খুব ফোলা ছিল আর পা বাঁকিয়ে দাঁড়াতেন। গলায় একটা আমের আটির মতো তাবিজ ঝুলত সব সময়। একটু বড় হবার পরে ডানপিটের দলে নাম লেখালেন। মক্তবের সহপাঠি রাবেয়াকে যখন হুজুর মারছিল, তখন সহ্য করতে না পেরে জ্বলন্ত পাটকাঠি ছুড়ে মারেন। তারপর গ্রাম ছেড়ে পালাতে হয়। এরপরের ঘটনা অনেকের জানা। সারাজীবন সুখ নাম আলেয়ার পিছনে ছুটেছেন আলেয়া চৌধুরী। যখন ভেবেছিলেন, এই বুঝি সুখের দেখা পেলেন, তখনই শুনতে হয়েছে একটা ভয়ংকর সংবাদ । ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করা কবি আলেয়া চৌধুরীর শেষ জীবনের স্বপ্ন ছিল, কেউ তাঁর আত্নজীবনী লিখবে! কেউ হয়ত লিখবে। কিন্তু সেটা আর দেখা হবে না তাঁর।
আলেয়া চৌধুরী বাঙালিদের মধ্যে একজনই। সারা পৃথিবীতেই ওনার মতো একজন মানুষ সৃষ্টি হয়নি। আর কোনদিন হয়ত হবেও না।
- DRIVER CHARGED WITH MANSLAUGHTER IN DEADLY HIT-AND-RUN IN MARCH ON JAMAICA AVENUE
- নিউইয়র্কে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাংসদ অধ্যাপক সেলিম ভূঁইয়াকে সংবর্ধনা, কুমিল্লা বিভাগ শুধু সময়ের ব্যাপার
- UN General Assembly Adopts Bangladesh-Led Culture of Peace Resolution
- বাংলাদেশের উত্থাপিত ‘শান্তি ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি’ বিষয়ক প্রস্তাব গ্রহণ করল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ
- নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় জল খাবার রেস্টুরেন্ট এর গ্র্যান্ড ওপেনিং
- New York Attorney General James Secures $375,000 from 1-800-Flowers for Deceiving Consumers About Automatic Subscription Renewals
- নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে বাংলাদেশি আমেরিকা পুলিশ কর্মকর্তার নামে সড়ক ‘ডিটেকটিভ দিদারুল ইসলাম ওয়ে’
- ECOSOC recommends UN General Assembly to take decision on Bangladesh and Nepal’s LDC graduation extension requests