Saturday, 25 July 2026 |
শিরোনাম
DRIVER CHARGED WITH MANSLAUGHTER IN DEADLY HIT-AND-RUN IN MARCH ON JAMAICA AVENUE নিউইয়র্কে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সাংসদ অধ্যাপক সেলিম ভূঁইয়াকে সংবর্ধনা, কুমিল্লা বিভাগ শুধু সময়ের ব্যাপার UN General Assembly Adopts Bangladesh-Led Culture of Peace Resolution বাংলাদেশের উত্থাপিত ‘শান্তি ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি’ বিষয়ক প্রস্তাব গ্রহণ করল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় জল খাবার রেস্টুরেন্ট এর গ্র্যান্ড ওপেনিং New York Attorney General James Secures $375,000 from 1-800-Flowers for Deceiving Consumers About Automatic Subscription Renewals নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে বাংলাদেশি আমেরিকা পুলিশ কর্মকর্তার নামে সড়ক ‘ডিটেকটিভ দিদারুল ইসলাম ওয়ে’ ECOSOC recommends UN General Assembly to take decision on Bangladesh and Nepal’s LDC graduation extension requests ইকোসকের সুপারিশ: বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সাধারণ পরিষদ Bangladesh co-chairs multi-stakeholder panel session on Global Road Safety, calls for stronger institutions to save lives
সব ক্যাটাগরি

সাংবাদিক দম্পতি খুন

অনলাইন ডেস্ক পঠিত: 123 বার

প্রকাশিত: February 11, 2012 | 9:08 PM

 

স্টাফ রিপোর্টার: টিভি মিডিয়ার দুই প্রিয় মুখ, তারকা-দম্পতি হিসেবে পরিচিত, সাগর ও রুনি আর নেই। শুক্রবার গভীর রাতে অজ্ঞাত ঘাতকদের নৃশংসতার শিকার হয়ে প্রাণ দিয়েছেন তারা। রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের পাঁচতলা ভবনের পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটে ঘটে এ রহস্যময় হত্যাকাণ্ড। সাগর-রুনি দম্পতির শিশুপুত্র রক্ষা পেয়েছে খুনিদের আক্রোশ থেকে। পুলিশ বলছে, এ হত্যা পরিকল্পিত। খুনিরা নিহতদের পরিচিত। রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজেদের ভাড়া বাসা থেকে মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং তার স্ত্রী এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি’র রক্তাক্ত মৃতদেহ গতকাল উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ খুনের প্রত্যক্ষদর্শী সাগর-রুনি দম্পতির ৫ বছরের একমাত্র সন্তান মাহিদ সরওয়ার মেঘ ঘটনাচক্রের খুনিদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।

 

পুলিশ বলছে, খুনিরা নিহতদের কারও সঙ্গেই বাসায় ঢুকেছিল। এ ঘটনায় বাড়ির তিনজন নিরাপত্তারক্ষীকে আটক করা হয়েছে। নিহত রুনির দুই ভাইকে ঘণ্টাব্যাপী জিজ্ঞাসাবাদ করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন।
গতকাল দিনের শুরুতেই এ মর্মান্তিক খবর শুনে সেখানে ছুটে যান বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা। পরে ঘটনাস্থলে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব, আইজিপি, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী, মহানগর পুলিশ কমিশনার। পশ্চিম রাজাবাজারে ৫৮/এ/২ নম্বর হোল্ডিংয়ে পাঁচতলা ভবনটির পাঁচতলার একটি ফ্ল্যাটে ছেলেকে নিয়ে থাকতেন সাগর-রুনি দম্পতি। গতকাল সকালে বাসার সামনে গিয়ে দেখা যায় শ’ শ’ উৎসুক মানুষের ভিড়। পুরো বাড়ি ঘিরে রেখেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। পাঁচতলার এ-৪ ফ্ল্যাটে থাকতেন সাগর-রুনি দম্পতি। সেখানে এখন বিলাপ করছেন নিহতের শোকাতুর স্বজনরা। সিআইডি’র ক্রাইম সিন ইউনিট আলামত সংগ্রহ করেছে। ফ্ল্যাটে ৩টি শোবার ঘর। মাঝের রুমে থাকতেন সাগর-রুনি। ওই রুমে ঢুকে দেখা যায়, মেঝেতে রুনির রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে। তার পেটে ও গলায় গভীর কাটা দাগ। সাগরের লাশ বিছানায় আড়াআড়িভাবে রাখা। গায়ে জামা নেই। পরনে জিন্সপ্যান্ট। পায়ের দিকে একটু গোটানো। তার শরীরে ধারালো অস্ত্রের অসংখ্য চিহ্ন। শ্বাসনালী কেটে দেয়া। হাত-পা বাঁধা। পুরো ঘর রক্তভেজা। ঘরের একদিকে একটি ওয়্যারড্রোব। তার ওপর একটি ল্যাপটপ কম্পিউটার। ড্রয়ার খোলা। তাতে একটি দামি মোবাইল ফোনসেট রাখা। ঘরে এক কোণে আলমারির দরজা খোলা। সেখান থেকে কয়েকটি কাপড় বেরিয়ে পড়েছে। ঘরের মেঝেতে দু’টি স্বর্ণালঙ্কারের খালি বাক্স পড়ে আছে। রুনি’র মা নুরুন নাহার মির্জা নাতির ফোন পেয়ে গতকাল প্রথম ফ্ল্যাটে যান। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি এসে তাদের রক্তাক্ত দেহ দেখে কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। চিৎকার করতে করতে আমি আমার ছেলেদের ফোন করি। ওরা এসে রুনির সহকর্মীদের খবর দেয়। পরে পুলিশ আসে। তিনি বলেন, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আমার নাতি মেঘ ফোন করে বলে- নানু, আম্মু-আব্বুকে মেরে ফেলেছে। তুমি এসো। আমি তখনই হন্তদন্ত হয়ে বাসায় যাই। বাসার দরজা খুলে দেয় মেঘ। তাকে কোলে নিয়ে ঘরে ঢুকে দেখি সাগর-রুনির লাশ। তিনি বলেন, আমাদের বাসা কাছে হওয়ার কারণে মেঘ আমার কাছেই থাকে। সাগর বা রুনি যে আগে অফিস থেকে ফেরে সে গিয়ে তাকে নিয়ে আসে। শুক্রবার রুনি রাত ৯টার দিকে অফিস থেকে ফিরে মেঘকে নিয়ে আসে। এ দম্পতির একমাত্র সন্তান মেঘ রাজাবাজারের উইলিয়াম কেরি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের কেজি ওয়ানের ছাত্র। ঘটনার সময় সে বাসাতেই ছিল। তবে সে স্পষ্ট করে কিছুই বলতে পারছে না। শুধু বলছে, মা-বাবাকে দু’জন মানুষ মেরে ফেলেছে। ওরা আমাকে পাশের ঘরে আটকে রেখেছিল। পরে কখন দরজা খুলে দেয় জানি না। বেরিয়ে দেখি বাবা-মা মেঝেতে শুয়ে আছে। ঘরে অনেক রক্ত। রুনি’র বড় ভাই নওশাদ আলম বলেন, আমি খুব ভোরে অফিসে যাই। সাড়ে ৭টার দিকে বাসা থেকে বের হই। পথেই মোবাইল ফোন আসে। ঘটনা শুনে দ্রুত এ ফ্ল্যাটে এসে দেখি সব শেষ। নওশাদ আলমের স্ত্রী পারভিন যুথি বলেন, খবর পাওয়ার পর আমরা ওই বাসায় গিয়ে দেখি দরজা খোলা। মেঘ আমাদের বলেছে, দু’জন লোক তার বাবা-মাকে মেরে দরজা খুলে বেরিয়ে গেছে। সাগর-রুনির ফ্ল্যাটের ঠিক পাশের ফ্ল্যাটেই থাকেন ব্যবসায়ী ফখরুল ইসলাম। তিনি বলেন, শুক্রবার রাত ১০টার দিকে বাসায় ফিরি। তবে রাতে ওদের ফ্ল্যাট থেকে তেমন কোন শব্দ পাইনি। সকালে হৈচৈ শুনে বের হয়েছি। সাগর-রুনির ফ্ল্যাটের ঠিক নিচের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা তৌফিকা রহমান জানান, রাত ২টার দিকে তিনি ঘুমাতে গিয়েছেন। কিন্তু তেমন কোন শব্দ তিনি পাননি। তবে রাত ২টা বা শোয়া ২টার দিকে বাড়ির সামনে একটা গাড়ি এসে থামার শব্দ পেয়েছিলেন। রাতে ওই ভবনে দায়িত্ব পালন করছিলেন নিরাপত্তারক্ষী পলাশ রুদ্র পাল। তিনি বলেন, রাত ২টার দিকে সাগর সাহেব বাসায় ফিরেছেন। এর আগে কখন রুনি ম্যাডাম বাসায় ঢুকেছেন তা আমি দেখিনি। তাদের বাসায় অপরিচিত কেউ আসেনি বা যায়নি। অতিথি রেজিস্ট্রার বইয়েও তাদের ফ্ল্যাটে কোন অতিথি যাওয়ার কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। পলাশ বলেন, ফ্ল্যাট মালিক এসোসিয়েশনের সভাপতি নুরুন্নবী সাহেব ভোর সাড়ে ৫টার দিকে আমাকে ফোন করে বলেন, কোথা থেকে কান্নার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। কোন ফ্ল্যাট থেকে শব্দটা আসছে দেখ তো। আমি এদিক ওদিকে দেখে তেমন কোন শব্দ না পেয়ে তাকে বলি হয়তো বাইরের ফ্ল্যাটে কোন বাচ্চা কাঁদছে।
মাছরাঙা টেলিভিশনের যুগ্ম বার্তা সম্পাদক মুতাসিম বিল্লাহ বলেন, রাত পৌনে ২টা পর্যন্ত অফিসে কাজ করেছেন সাগর। এরপর বাসায় ফেরেন। এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জিএম তসলিম জানান, গতকাল রুনির মর্নিং ডিউটি ছিল। ডিউটি শেষে তিনি সাড়ে ৪টার দিকে অফিস থেকে বেরিয়ে যান। শেরেবাংলানগর থানার ওসি (তদন্ত) আহমদ কবির বলেন, রুনি’র সঙ্গেই হয়তো খুনিরা ঢুকেছিল। এ কারণেই রেজিস্ট্রার খাতায় তাদের নাম এন্ট্রি করা হয়নি। অথবা ফ্ল্যাটে আগে থেকেই ঘনিষ্ঠ কেউ ছিল। যারা নিরাপত্তারক্ষীর চোখ ফাঁকি দিয়ে খুনিদের ফ্ল্যাটে নিয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেন, এমনও হতে পারে রাতে রুনি ফেরার পরও সাগরের জন্য অপেক্ষা করেছে খুনিরা। গভীর রাতে সাগর ফিরলে তাকে আক্রমণ করা হয়েছে। তখন রুনি তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে তাকেও হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, রুনির এক ভাই ফ্ল্যাটে রাত ১০টা পর্যন্ত ছিল- আমাদের কাছে এমন তথ্য এসেছে। তেজগাঁও জোনের উপপুলিশ কমিশনার ইমাম হোসেন বলেন, আমাদের ধারণা খুনিরা বিষয়টিকে ডাকাতি বলে চালানোর চেষ্টা করেছে। এজন্য তারা রান্নাঘরের গ্রিল কেটে একটি ছোট ফাঁক তৈরি করে। কিন্তু আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি, সেখান দিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক কারও বের হওয়া সম্ভব নয়। হত্যাকারী স্বজনদের কেউ কিনা- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা সব বিষয় মাথায় রেখেই তদন্ত করছি। ইতিমধ্যে নিরাপত্তারক্ষীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। স্বজনদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। রুনির দুই ভাই নওশাদ আলম ও নওদিশ আলমকে ডিবি অফিসে নিয়ে ঘণ্টাব্যাপী জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার মাহবুবুর রহমান। র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল জিয়া-উল আহসান বলেন, আমাদের ধারণা ঘাতকরা পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। খুনিরা তাদের পূর্বপরিচিত ছিল। শেষ রাতের দিকে তাদের হত্যা করা হয়েছে, এ কারণে সকাল ১১টায়ও লাশের শরীর গরম ছিল। তাজা রক্ত বের হচ্ছিল। তিনি বলেন, এটি কোন ডাকাতির ঘটনা নয়। কারণ ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র কিছুই খোয়া যায়নি। ওদিকে দু’টি মরদেহের ময়নাতদন্তের পর ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, আঘাতের ধরন  দেখে মনে হয়েছে খুনি অপেশাদার। নির্মমভাবে কুপিয়ে কুপিয়ে তাদের হত্যা করা হয়েছে। পরে মৃত্যু নিশ্চিত করতে গলা কেটে দেয়া হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, দু’জনের শরীরেই ছুরি ও ধারালো অস্ত্রের এলোপাতাড়ি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। আঘাতের ধরন দেখে আমাদের মনে হয়েছে, খুনি অপেশাদার কেউ। কারণ পেশাদার হলে খুনি জানতো কোথায় আঘাত করলে মৃত্যু নিশ্চিত করা যাবে। সাগরের দেহে ১৯টি বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে জানান তিনি।
জানাজা: গতকাল দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে এই সাংবাদিক দম্পতির মরদেহ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের প্রথম জানাজায় অংশ নেন এই দুই সাংবাদিকের সহকর্মী, রাজনৈতিক নেতা ও স্বজনরা। তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর নানক, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদের শিরিন আখতারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সাংবাদিক সংগঠনের  নেতাকর্মীরা এ সময় সাগর-রুনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। পরে রাতেই তাদের আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
উইমেন চেম্বারের শোক
মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারোয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি নৃশংসভাবে খুন হওয়ায় বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি গভীরভাবে শোকাহত এবং মর্মাহত। আমরা তাদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি এবং এই ঘটনায় দোষী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের শাস্তি দাবি করছি। গতকাল বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স (বিডব্লিউসিসিআই) সচিব আহমেদ ওমর ফারুকের স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ শোক প্রকাশ করা হয়।
সাগরের শেষ নির্দেশনা-
‘খবর নিয়েন, কোথাও
দুর্ঘটনা ঘটে কিনা’
‘খোঁজ-খবর রাখেন, কোথাও কোন কিছু হয় কিনা’। রাত ২টায় অফিস থেকে বাসায় রওনা দেয়ার আগমুহূর্তে অফিসের সহকর্মী নূর সিদ্দিকীকে শেষবারের মতো এমন সতর্ক নির্দেশনা দিয়েছিলেন সাগর সরওয়ার। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস। সে নির্দেশনা পালনে রাত অবধি জেগে তিনি রাজধানীবাসীর খবর নিলেও মিস করেছেন তার প্রিয় সাংবাদিক দম্পতির খবর নিতে। নূর সিদ্দিকী আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলেন, সাগর ভাইয়ের ডিউটি ছিল সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত। আমি অফিসে ঢুকেছিলাম রাত পৌনে ৯টায়। রাত ১১টায় বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার আমাকে বলেন, জগন্নাথ হলে গণ্ডগোল হয়েছে। খবর নিয়েন। অফিস থেকে গাড়ি নিয়ে ছুটে বের হই। পথে শাহবাগ পৌঁছে জানতে পারি ঘটনা তেমন বড় নয়। তখনই সরওয়ার ভাইকে বলি- কিছুই হয়নি। একটু পর রাত সাড়ে ১২টার দিকে কৌতূহলবশত জগন্নাথ হলে ঘুরতে যাই। গেইটের কাছে যাওয়া মাত্রই কিছু ছাত্র আমাদের গাড়ি ভাঙচুর করে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে জানাই। প্রথমেই জানতে চান- আমার কোন ক্ষতি হয়েছে কিনা। নিশ্চিন্ত হয়ে তিনি বিষয়টি নিয়ে আলমগীর ভাইয়ের সঙ্গে পরামর্শ করেন। ওই ঘটনার ওপর  ‘ফোনো’ দিতে বলেন। আমি রেডি হয়ে অপেক্ষায় থাকি তার ফোনের জন্য। রাত একটা পেরিয়ে গেলেও তিনি আর ফোন দেননি। কিছুক্ষণ পর ফিরে আসি অফিসে। তখন রাত ২টার কাছাকাছি। গাড়ি থেকে নেমেই অফিসের নিচে সাগর ভাইয়ের দেখা পাই। ছুটে আসেন আমার কাছে। আমি ব্যথা পেয়েছি কিনা ফের জানতে চান। আমার কথায় আশ্বস্ত হয়ে তিনি ঘুরে ঘুরে পরখ করতে থাকেন গাড়ির চতুর্দিক। বলেন, নিউজটি তৈরি করে রাখেন। অফিস চাইলে দিয়ে দেবেন। এরপর যখন বাসায় যাওয়ার গাড়িতে উঠতে যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই ফের বলে উঠেন- কোথাও কোন দুর্ঘটনা ঘটে কিনা খোঁজ-খবর নিয়েন। নূর সিদ্দিকী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি তার কথা মোটেই অবহেলা করিনি। রাত পেরিয়ে জেগে ছিলাম সকাল অবধি। কোথাও তেমন গুরুতর দুর্ঘটনা খুঁজে পাইনি। অফিস থেকে বেরিয়ে যাই সকাল ৭টায়। প্রায় দু’ঘণ্টা পরে জানতে পারি আমাদের সবার প্রিয় সাংবাদিক দম্পতি আর বেঁচে নেই।

সাগরের বই ভাষাচিত্রে
স্টাফ রিপোর্টার: সাগর আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। সাগর নেই কিন্তু এবারের মেলায় আছে তার লেখা বই। শুক্রবার রাতে নিজ বাসায় অজ্ঞাত খুনিদের হাতে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি।
প্রকাশিত বইটি নিয়ে তার ফেসবুক পেজে পাওয়া যায় একটি স্ট্যাটাস। ‘নীল পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে এঁকে ফেলেছিলাম বইটি। পরে লিখে ফেললাম। গত গ্রন্থমেলার শেষের দিকে বের করলো ভাষাচিত্র। বইটি  মেলাতেও আছে। ওদের স্টল নম্বর ২০০। শান্তিবাহিনী আর পাহাড়ের রাজনীতি, সেই সময় এবং এই সময় এমএন লারমা, সন্তু লারমা আর পাহাড়ের মানুষ এই বইয়ের চরিত্র।’
নিজের চোখে দেখা পাহাড়ের জীবনকে কালিও কলমের তুলিতে এঁকেছেন তিনি। ঘুরেছেন পাহাড় থেকে পাহাড়ে, ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী ঘেরা জনপদে।
এটি ছাড়াও সাগরের ছুঁয়ে জোছনার ছায়া শিরোনামে একটি গল্প গ্রন্থ বের হয়েছে এবারের মেলায়। সাম্প্রতিক প্রকাশনের স্টলে বইটি পাওয়া যাবে।
সাগর দম্পতির পাঁচবছরের ছোট্ট ছেলে মেঘ। কেমন যেন নির্বাক সে। ছোট্ট সোনা আর কি খুঁজে পাবে অকালে হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মা ও বাবাকে? 
দৈনিক সংবাদ দিয়ে সাংবাদিকতার জীবন শুরু হয়েছিল সাগরের। শেষ হলো মাছরাঙা টেলিভিশন দিয়ে। যার শুরু ও মাঝের সময়টা ছিল সুন্দর ও সাফল্যে ভরা। তার শেষটা কেন হবে এমন নির্মম? 
এমন প্রশ্নই যেন সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ীদের চোখে মুখে। ভাষাচিত্রের স্বত্বাধিকারী খন্দকার সোহেল যেমন বললেন, আমি সাগর ভাইকে কোন দিন একটু রাগ করতে দেখেনি, তিনি কখনও কাউকে ধমক দিতেন না। অথচ সেই মানুষটাকে আজ এভাবে খুন হতে হলো। সোহেল বলেন, সাগরের শরীরে থাকা ছুরির পঁচিশটি আঘাতে শুধু তার নিজের শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়নি। ক্ষতবিক্ষত হয়েছে পুরো দেশ, হয়েছে পুরো জাতি। সোহেলের কণ্ঠ যেন স্তব্ধ হয়ে আসে। একটু থেমে বললেন, ওর বিয়ের গায়ে হলুদ হয়েছিল আমার হাতে, এখন বন্ধুটির কবরে মাটি দেবো তাও এই হাত দিয়ে…।

মেঘের সামনে ঘোর অন্ধকার

 হুর আহমদ: সাগর-মেহেরুন দম্পতির একমাত্র সন্তান মেঘ। ৫ বছরের মেঘের সামনেই হত্যা করা হয় তার মা-বাবাকে। অবুঝ শিশু মেঘের সামনে এখন ঘোর অন্ধকার। গতকাল সবার সামনে হত্যার বর্ণনা দেয় এ শিশু। বলে, ওদের হাতে পিস্তল ছিল। আমাকে গুলি করতে চেয়েছিল। মেঘ আরও বলে, দু’জন লোক বাবা-মাকে মেরে ফেললো। মা ডিমভাজি দিয়ে ভাত খেতে দিয়েছিল ওদের। প্রথমে বাবাকে ছুরি মারলো। তারপর মাকেও মারলো। বাবা-মায়ের শরীর দিয়ে অনেক রক্ত পড়ছিল। ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সে। ঘটনাক্রমে খুনিদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। শিশু মেঘের সামনেই ঘাতকরা তার বাবা-মাকে কুপিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে খুন করে। খুনিরা পালিয়ে যাওয়ার পর মেঘ তার মায়ের মোবাইল ফোন থেকে তার নানীকে ফোন করে ঘটনা জানায়। পরে রুনির দুই ভাই ঘটনাস্থলে এসে মেঘকে অন্যত্র নিয়ে যায়। রুনির বড় ভাই নওশাদ আলম বলেন, সে খুবই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। এছাড়া সাংবাদিক-পুলিশ তাকে নানা প্রশ্ন করছে। এজন্য আমরা তাকে অন্যত্র রেখেছি। যেখানে মেঘকে রাখা হয় সেই ফ্ল্যাটের সন্ধান পেতে অনেক বেগ পেতে হয়। পরে জানা যায়, তাকে রাখা হয়েছে রাজাবাজারে রুনির নানীর বাড়িতে। সেখানে গেলে স্বজনরা মেঘের সঙ্গে কথা বলতে দিতে রাজি হননি। অনেক অনুরোধের পর নিয়ে আসা হয় তাকে। মেঘ আধো আধো করে বলে, দুইটা লোক বাবা-মাকে অনেক মারলো। তারপর মেরেই ফেললো। আমি কাঁদছিলাম তখন আমাকে পিস্তল দিয়ে গুলি করতে চাইলো। পরে পাশের ঘরে লক করে রাখলো। তারপর কখন লক খুললো জানি না। একবার দেখি দরজা খোলা। বেরিয়ে বাবা মায়ের ঘরে গিয়ে দেখি অনেক রক্ত। মেঝেতে শুয়ে আছে বাবা মা। তখন অনেক খুঁজে খুঁজে নানুকে ফোন করলাম। যারা বাবা-মাকে মেরেছে তাদের দেখলে চিনতে পারবে কি না জানতে চাইলে মেঘ বলে, দেখলে হয়তো চিনতে পারবো। তারা লাল সাদা শার্ট পরে এসেছিল। বাসায় মা তাদের ডিমভাজি দিয়ে ভাত খেতে দিয়েছিল। শুক্রবার আশুলিয়ায় পিকনিকে গিয়েছিল সাগর-রুনি। মেঘ বলে ওদের পিকনিকেও দেখেছি। আমাদের সঙ্গেই ছিল। কখন মারলো জানতে চাইলে মেঘ বলে, অনেকক্ষণ ধরে মেরেছে। শেষে যখন মারছিলো তখন রাত। মারার পর তারা দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। ফ্ল্যাটের ভিড় থেকে বাঁচাতে মেঘকে প্রায় ৩ ঘণ্টা রাখা হয় তেতলার একটি ফ্ল্যাটে। ওই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা আমিনা বেগম বলেন, আমি মেঘকে অনেক কথা জিজ্ঞেস করেছি। কিন্তু সে সব কিছু ভালভাবে বলতে পারেনি। শুধু বলেছে দু’জন লোক তার বাবা-মাকে মেরে ফেলেছে। যাদের ডিম দিয়ে ভাত খেতে দিয়েছিল তার মা। তিনি বলেন, আমার এখানে যখন মেঘকে নিয়ে আসে তখন ওর শরীরে রক্তের দাগ লেগেছিল। মেঘের বড় মামী নাহিদা পারভীন যুথী বলেন, মেঘ বাবা মায়ের পাশের ঘরে একাই থাকতো। তবে দরজা খোলা থাকতো। কোন কিছু লাগলে সে মা-বাবার ঘরে চলে যেতো। শুক্রবারও সে তার ঘরেই ছিল। খুনিরা তার বাবা মাকে মারতে শুরু করলে সে ঘুম থেকে উঠে ওই ঘরে যায়। কিন্তু খুনিরা আবার তাকে তার ঘরে নিয়ে আটকে রাখে। পরে দরজা খুলে দিলে সে বের হয়। তিনি বলেন, আমরা ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে সবগুলো দরজা খোলা পেয়েছি। মানবজমিন

বিজ্ঞাপন / স্পন্সরড কন্টেন্ট
ট্যাগ:
Situs Streaming JAV