যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরীর জীবনের স্বপ্ন ছিল শিক্ষার আলো ছড়ানো
EPSON MFP image
মো: রশিদুল হক: বাংলাদেশে বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার প্রাত:স্মরনীয় কৃতি সন্তান (১) নবীনগর উপজেলার বিটঘরে জন্ম মহেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য (২) মুরাদনগর উপজেলার (বর্তমানে বাঙ্গরা উপজেলা) শ্রীকাইলে জন্ম ক্যাপ্টেন নরেন্দ্র নাথ দত্ত এম,বি (ক্যাল) (৩) বুড়িচং উপজেলার নিমসারে জন্ম হাজী জুনাব আলী (৪) ব্রাক্ষণপাড়া উপজেলার ধান্য দৌল গ্রামের জন্ম মোশারফ হোসেন খান চৌধুরী এ চারজন কোন ধনাঢ্য জমিদার রায় বাহাদুর, খান বাহাদুর কিংবা নবাব পুত্র ছিলেন না। কিন্তু আজ তাঁরা কেন স্মরনীয় বরনীয়? কারণ নিজ কায়িক শ্রম ও ঘামে ঝড়া কষ্টাজিত
উপার্জন দিয়ে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছেন এবং তিলে তিলে নিজ এলাকায় গড়ে তুলেছেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্কুল কলেজ মাদ্রাসা, পাঠশালা, দাত্যব্য চিকিৎসালয়সহ আরো অনেক জনহিতকর স্থাপনা যা তাঁদেরেকে করছে চিরস্মরনীয় ও মহীয়ান। আমার বক্তব্য উনাদের জীবনের ব্যাপকতা ও বিশালতা নিয়ে নয় কিংবা কোন প্রকার মোষামোদি বা চাটুঁকারিতা নয়। আমি শুধু দু’চার কথায় উনারা কি ছিলেন, কি করেছেন, কেন করেছেন, কীভাবে করেছেন এ প্রসংঙ্গে বলবো। মহেশ বাবু বৃটিশ আমলে নিজ গ্রামে দা কাঁচি, কোদাল, খন্তি ও লাঙ্গলে ফালের দোকান দেন। তিনি কুমিল্লা শহরে এসে পুরাতন লোহা-লক্কড়ের ব্যবসায় প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। শিক্ষা বিস্তারে উনার র্কীতি কুমিল্লা শহরে ঈশ্বর পাঠশালা (হাইস্কুল) নিবেদিতা গার্লস হাইস্কুল, সুবিশাল, মহেশাঙ্গন, ফ্রি চিকিৎসালয়, ফ্রি ছাত্রাবাস, বিশাল লাইব্রেরী ও উপাসনালয় ইত্যাদি বিটঘর নিজ
গ্রামে বিটঘর হাই স্কুল ও করেছেন। কর্মসংস্থানের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন বিখ্যাত হোমিওপ্যাথিক ও বায়োকেমিক ঔষুধ কারখানা এম,সি ভট্রাচার্য এন্ড কোং কলিকাতা। কুমিল্লা বোর্ড অফিসের সামনে ও ঢাকা সদর ঘাটে কোং এর বিশাল শাখা বর্তমানে ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ন্ত্রনে। কসবাবাসীগণ ভূলে যাবেন না, কসবা পুরাতন বাজারে যেতে এক পয়সার বদলে লোহার পুল। দানবীর মহেশ বাবু গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলেন। কসবা পুরান বাজারের খেয়াঘাটে একটি লোক কান্নাকাটি করছে। ছিদ্রওয়ালা এক পয়সা খোয়া ভাড়া। মাঝি এক পয়সার জন্য লোকটাকে পার করছেনা। মহেশ বাবু লোকটা সংগে নিয়ে খেয়া পার হলেন এবং এক মাসের মধ্যে টাটা কোম্পানীর রড, বীম ও এঙ্গেল দিয়ে নদীতে মজবুত পুল তৈরী করে দিলেন। আমি নিজেও এই পুল পার হয়েছি। এহাই ঐতিহাসিক এক পয়সার বদলে লোহারপুল। তারপর ক্যাপ্টেন দত্তের কথা। নিতান্ত দরিদ্র পিতা কৃষ্ণ কুমার দত্তের সন্তান। কুমিল্লা শহরে স্কুল জীবন কাটে। থাকা-খাওয়া, পড়াশুনা ও কেরোসিনের খরচ জোগাতে তিনি রাজগঞ্জ বাজারে সকাল-সন্ধ্যায় অবসরে পাইকারি দোকান থেকে শাক-সবজি ও তরি তরকারি নিয়ে ফেরি করে বিত্রিু করতেন। কুমিল্লা থেকে এন্টান্স পাশ করে কলকাতায় যান এম,বি (ক্যাল) ডিগ্রী নেয়ার পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-৪৫) ডাক্তার হিসাবে সামরিক বাহিনীতে যোগদান করেন।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর চাকুরী ছেড়ে দেন। সামরিক বাহিনী থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে নিরেট পাড়াগাঁও যোগাযোগ বিছিন্ন পায়ে হাঁটা বা নৌকা ছাড়া কোন যোগাযোগ অন্ধকাররাচ্ছন্ন নিজ গ্রামে শ্রীকাইল এ শিক্ষার আলো জ্বালানোর জন্য শ্রীকাইল কৃষ্ণ কুমার হাই স্কুল এবং সুদৃশ্য অট্রালিকায় শ্রীকাইল ডিগ্রী কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। বৃটিশ আমলে মেঘনা নদীর পূর্ব পাড়ে পাকিস্তান অংশে প্রথম ৫ তলা বিল্ডিং, অধ্যক্ষ বাস ভবন দীঘির পশ্চিম পাড়ে তিন তলা বিল্ডিং। কলকাতা থেকে স্টীমারে করে টাটা কোং এর রড, বীম ও শীট এবং অত্যাধুনিক বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও গ্যাসপ্লান্ট কলেজের জন্য আনেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কলতাকায় স্থাপন করেন বেঙ্গল ইমিওনিটি ফার্মাসিটিক্যালস নামক ঔষধ শিল্প। চিরকুমার ক্যাপ্টেন দত্তকে আমার মরহুম আব্বাজান জিজ্ঞাসা করেছিলেন, স্যার আপনি বিয়ে করেন না কেন? প্রত্যুত্তরে বলেন, হক সাহেব শুনুন বিয়ে করবো কেন? সন্তানের জন্য এইতো, ঐ যে দেখছেন, আমার কলেজের শতশত ছাত্র। এরাইতো আমার সন্তান। সরকারকে ধন্যবাদ, ২০১৭ সালে কলেজ সরকারী হয়েছে। বিলম্বে হলেও ভাল। ক্যাপ্টেন দত্তের জ্বালানো জ্ঞানের আলো জ্বলছে ও জ্বলবে। শুনুন কুমিল্লার বুড়িচং
উপজেলার নিমসার এর হাজী জুনার আলীর কথা। তিনি গ্রাম থেকে কাঁধে করে ভার দিয়ে কখনো মাথায় টুকরি নিয়ে তরিতরকারি কচু, লতি, করল্লা, কৈডা, লাউ-কুমড়া ইত্যাদি রোদ, ঝড়-বৃষ্টিতে কুমিল্লা শহরে পায়ে হেঁটে হেঁটে ফেরি করতেন। তিনি সেই জুনাব আলী যিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন নিমসার হাজী জুনাব আলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, নিমসার হাইস্কুল, নিমসার ওয়াহিদানুর গার্লস হাইস্কুল, মসজিদ শিকারপুর মাদ্রাসা, ঈদগাহ, এতিমখানা ইত্যাদি। তিনি লেখাপড়া জানতেন না কিন্তু জ্ঞানের আলো ছিল ওনার মনে। তাই অধ্যক্ষ মিহির কুমার দত্তের হাতে এক তা সাদা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন আপনার কলমে যতক্ষণ কালি আছে আপনি লেখেন কী কী লাগবে আমার কলেজের জন্য? আমি সব ক্রয় করে দিতেছি। শ্রদ্ধেয় পাঠকগণ চিন্তা করেন কী ছিল উনার মনে। এতো কষ্ট ও ঘাম, রৌদ্র , ঝড়-বৃষ্টির মাঝে কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে ঘরে ঘরে আলো জ্বালানোর কী প্রয়াস। পরিশেষে অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষকের ছেলে মোশারফ হোসেন খান চৌধুরীর কথা বলবো গ্রামের ছেলে। শৈশবে পিতৃহারা। জীবন জীবিকার তাগিদে প্রথমে মধ্যপ্রাচ্যের কাতারে পরে নিউইয়র্কে। খেটে খাওয়া মানুষ, ঘাম ঝরানো পয়সা।
এখানে তিনি অনিয়মিত ট্যাক্সি ক্যাব চালক। শ্রমজীবি মানুষ হিসেবে আমেরিকায় ১৯৮৯ সাল থেকে। অত্যন্ত সামাজিক, রুচিশীল ও মার্জিত ভদ্রলোক। নিউইয়র্কে সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত সরব উপস্থিতি। কুমিল্লা সোসাইটি অব নর্থ আমেরিকার সক্রিয় কর্মী এবং প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট। কুমিল্লা ফ্রেন্ডস সোসাইটি ফোরামের সদস্য হিসেবে ব্রাক্ষ্মনপাড়া যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। ইনি ১৯৮৯ সালে নিজ উদ্যোগে ও অর্থায়নে প্রথম প্রতিষ্ঠা করেন নিজগ্রামে আব্দুর রাজ্জাক খান চৌধুরী হাইস্কুল। তারপর পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠা করেন ৭টি প্রতিষ্ঠান। (১) মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ (দশটি বিষয়ে অনার্স) ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা প্রায় ৪০০০ (২) আ: মতিন খসরু মহিলা কলেজ ছাত্রী সংখ্যা প্রায় ৫০০ (৩) আব্দুর রাজ্জাক খান চৌধুরী হাইস্কুল ছাত্র ছাত্রী সংখ্যা প্রায় ১০০০। (৪) মুুমু-রোহান চাইল্ড
প্রিক্যাডেট (৫) আশেদা-যোবেদা মাদ্রাসা (৬) মোশাররফ হোসেন খান চৌধুরী ফাউন্ডেশন (৭) ব্রাক্ষণপাড়া ডায়াবেটিক হাসপাতাল । সম্পূর্ন নিজ অর্থে ও উদ্যোগে ক্রয় করা জমির উপর তিলে তিলে গায়ে খাটা ঘামে ঝড়া পয়সায় নির্মিত বহুতল বিশিষ্ট দালান হচ্ছে ও সুপ্রশস্ত খেলার মাঠ ও অডিটোরিয়াম, চিত্ত বিনোদনের জন্য বিনোদন প্রাঙ্গন এবং সুদৃশ্য ফুল ও ফলের বাগান। দেখলে মন আনন্দ ও বিস্ময়ে ভরে যায়। কুমিল্লা জেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কি.মি. দূরে প্রত্যন্ত এলাকায় এই মনোরম ও অবাক লাগা স্থাপনা। ইনি ইচ্ছে করলে এই কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে লাভজনক ব্যবসা-বাণিজ্য, হাসপাতাল, বাড়ি-ঘর, সুপারমার্কেট, শিল্প কারখানা করতে পারতেন। কিন্তু তা করেন নাই কেন? শৈশব থেকে তার মনে এক সুপ্ত শিক্ষার আলোর দানা বেঁেধছিল যা ব্যক্তিজীবনের চাওয়া-পাওয়া ও ভোগ এবং লোভ লালসাকে দূরে ঠেলে দিয়ে মোশারফকে এগিয়ে নিয়েছে এক অম্লান ও দ্বীপ্তিমান আলোক বর্তিকার দিকে। প্রতিটি ঘরে ঘরে এখন শিক্ষার আলো। ভাবুনতো একবার; একজন রিক্সাচালক, ঠেলাগাড়ী চালক, কৃষক, শ্রমিক কিংবা অটোড্রাইভারের ছেলে/মেয়ে এসএসসি পাশ করার পর প্রতিমাসে প্রায় দশ হাজার টাকা ব্যয় করে কলেজে পড়া হবে কীনা? কিন্তু আজ ঐ এলাকায় স্বচক্ষে দেখে এলাম পায়ে স্পঞ্জ বা রাবারের স্যান্ডেল পরনে লুঙ্গি বা পাজামা অথবা সাধারণ সালোয়ার কামিজ পরিধান করে ছেলে মেয়েরা কলেজে আসে। বাড়ীতে সকাল বেলায় পান্তাভাত কিংবা শাক সুটকি যা মিলে তা খেয়ে বিনা বেতন বা অর্ধবেতনে বি.এ অনার্স, বি.এস.এস, বিএসসি, এম.এ পাশ দিয়ে জীবনকে কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করে স্বস্ব পরিবারকে আলোকিত, মান সম্মত জীবিকা ও স্বচ্ছলতা দিয়ে এগিয়ে নিল। কেউবা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, উকিল প্রফেসর-ম্যাজিষ্ট্রেট বা অন্য কোন
পেশাজীবি। এটা সম্ভব হলো কার কারনে? সম্ভব হয়েছে একমাত্র মোশারফের এই শ্রমে, ঘামে, গায়ে খাটা কষ্টার্জিত টাকায় তৈরি ঐ প্রতিষ্ঠানের অবদানে। সর্বশেষে প্রবাসি ভাইবোনদেরকে বলবো আপনারা নিজ নিজ অবস্থান থেকে যার যার সামর্থ্য নিয়ে নিজ নিজ এলাকায় সমাজ সংস্কার ও শিক্ষা বিস্তারে প্রয়োজনীয় কিছু করুন। সমাজকে আরো এগিয়ে নিন। অশেষ ধন্যবাদ। শুভ কামনায়।
লেখক: প্রাক্তন সিনিয়র শিক্ষ: কুমিল্লা জিলা স্কুল, নবাব ফয়জুন্নেসা ও ব্রাক্ষ্মনবাড়ীয়া অন্নছা সরকারী হাইস্কুল। প্রতিষ্ঠাতা:কুমিল্লা মেমোরিয়াল কিন্ডারগার্টেন এন্ড স্কুল, সহ-সভাপতি: কুমিল্লা ফ্রেন্ডস ফোরাম।
- নিউইয়র্কে গোল্ডেন এইজ হোম কেয়ারের ইফতার মাহফিল
- নিউইয়র্ক বাংলাদেশি আমেরিকান লায়ন্স ক্লাবের ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত
- নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৭ মার্চ ঘড়ির কাঁটা এক ঘন্টা এগিয়ে যাবে
- নিউইয়র্কে জ্যামাইকা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডস সোসাইটির বার্ষিক ইফতার ও দোয়া মাহফিল
- Radwan Chowdhury Announces Candidacy for Montgomery County Council At-Large, Launches “Five-Pillar Blueprint” for Accountable Governance.
- New York Attorney General James Reminds New Yorkers of SNAP Work Requirements
- নিউইয়র্কে ডিজিটাল ওয়ান ট্র্যাভেলস এবং বাংলা ট্র্যাভেলস এর ইফতার মাহফিল
- রূপসী চাঁদপুর ফাউন্ডেশন নিউইয়র্ক ইনক’র ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত








